পেনসিলের দরবারে (২)

রোশনিদি যতই প্রবল খুশি হয়ে “কি ভাল হবে রে, মাকে আর ফোন থেকে পেনসিল পড়ে শোনাতে হবে না, বইটাই কিনে দেওয়া যাবে” বলুক, আমার মানসিক যন্ত্রণা সেটাতে বিন্দুমাত্র কমছে না।

মনে বড় দাগা লেগেছে।

একেক সময় মনে হয় না জীবনটা একটা মহানিশা?

বহু ভুলভুলাইয়ার জল খেয়ে, ডুবতে ডুবতে ভাসতে ভাসতে ভেবেছিলাম, আর কেন? অনেক তো হল। এবার প্রাণটা একটু  শান্তি শান্তি করছে।

লোকে অন্যকে গালাগালি দিলে হাসি হাসি মুখে এনকারেজ করবো, চুমু দিতে এলে কূট সন্দিগ্ধ গলায় রুমমেটকে “এর ঠিক মতলব বোঝা যাচ্ছে না” বলে সতর্ক করে দেব না, মুখের ওপর সপাট সোজা জবাব দিয়ে জনতাকে আপসেট করে মিচকে চোখে তাকাবো না  – মোদ্দা কথা এই “বাপরে কি ডানপিটে মেয়ে” ভাবমূর্তি সমুলে উৎপাটিত করে ব্যাকগ্রাউন্ডে স্যাক্সোফোন সহকারে  “তোমরা যা বল তাই বল” চলাকালীন নিজেকে দুধসাদা পতাকায় মুড়ে রাখবার প্রয়াস  আমার সদাসর্বদা জারি থাকবে।  থাকবেই।

বলতে নেই প্রসেসটা শুরু হয়েছিলো খারাপ না।

আকাশে-বাতাসে চমৎকার একটা “এই বেশ ভালো আছি” ভাব।

সব ঘেঁটে লাট করে দিল দিন পনেরো আগের সেই শুক্রবারের সন্ধ্যেটা।

ইম্পসিবল ঠাণ্ডা লেগেছে দুজনেরই। সে এমন কাশি যে খাট দেখলেই ঘাটের কথা মনে হচ্ছে।

এক্ষণে কাজ থেকে ফিরে সবে স্নান করতে ঢুকেছি, রাশি রাশি চিন্তা নিয়ে।

পরের দিন সকালে ফ্রেঞ্চক্লাস সেরেই দৌড়তে হবে- ইন্ডিয়ান বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশান অফ মন্ট্রিয়লের মহাযজ্ঞে। অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং বলে কথা।

“যাই থাকুক না কেন, মিটিংটায় ঠিক সময়ে পৌঁছাবে এটা কি আশা করতে পারি? তোমার ভোটটা দরকার সেটা বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই”- কানের কাছে চলতেই থাকে বাণী।

আগের বছরে তাদের কাজের খতিয়ান পেশ করবার পর ভেঙ্গে যাবে বর্তমান কমিটি, ভোট হবে, দায়িত্ব নেবে সদ্য নির্বাচিত দল।

গত দশদিন ধরে পাশাপাশি দুটো পাওয়ারপয়েন্ট চলছে জায়ান্ট স্ক্রিনে।

ট্রেজারার ময়ূখ চৌধুরী ফিনান্সিয়াল ডিটেল বানাচ্ছেন, একই সঙ্গে চলছে থিসিসে শেষ ছোঁয়া দেওয়ার কাজ।

ইলেকট্রনিক সাবমিশনটাও যে পড়েছে একই সময়ে।

এত কিছু ভেতরে চলতে থাকলে স্নানের পরেও মগজ বিশেষ ঠাণ্ডা হয় না স্বাভাবিক ভাবেই। অন্যমনস্কের মতো বেরিয়ে আসতেই বুকে হাতুড়ির শব্দ।

“এই ভয়ংকর আওয়াজটা আসছে কোথা থেকে? কিন্তু এতদিন তো ছিল না, বলতে নেই। হঠাৎ এভাবে? তাহলে কি এই ঠাণ্ডা লাগা থেকেই ফিরে এল সেই আতংকের দিনগুলো? আবার? মিথ্যেই ভেবেছিলাম সেরে উঠেছে ও?”

অ্যাজমা অ্যাটাক যে কি অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক সেটা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন তাই এনিয়ে আর বেশি কথা বলবার দরকার নেই।

বাথরূম থেকে বসবার ঘর-সাড়ে পাঁচ সেকেন্ডে নিঃশ্বাস বন্ধ করে উড়ে আসতে আসতে ভেবে নিয়েছি, বন্ধুদের নয়। আগে নাইন-ওয়ান –ওয়ান কল করতে হবে।

এসে যে দৃশ্য দেখলাম তারপরেও যে পেনসিলে তার বর্ণনা দেওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে হয়েছে, সেইটাই আমার জীবনের এক অন্যতম মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।

দেখি কি, কি একটা চলছে ইউটিউবে আর একা একা বুক চেপে ধরে গড়িয়ে গড়িয়ে হাসছে ছোকরা।

উদ্ভুট্টে ভিডিও দেখে স্ট্রেস রিলিজ করে পাবলিকটা কেন যে বিস্মরণ হয়েছিলাম।

চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করতে করতে হাঁটা লাগিয়েছি, হাত চেপে ধরল ।

“এইটা না দেখে চলে যেয়ো না। প্লিজ। বেঁচে থাকবার মানে বদলে যাবে দেখো”-বলতে বলতে আবার লুটোপুটি খেতে থাকে সে।

মানে বদলে গেছে বইকি।

আমার জীবন আবার অশান্তিনিকেতন।

একটা কথা কানে নিচ্ছে না।

যখনি দেখছে প্যাঁচে পড়বার স্লাইটেস্ট চান্স আছে, পুট করে চালিয়ে দিচ্ছে বস্তুটা।

ভোটের পর যিনি আবার অ্যাসোসিয়েশানের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

আর নীল-গোলাপি আবছা মায়ায় অন্তরাত্মা অবশ করে দিচ্ছেন পর্দায়  নৃত্যরত

নান আদ্যর দ্যান- দ্য তাহের শাহ।।

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. torr ai lekhatar sob mormo uddhar korbar amar mogoj nai tai comment korlam na.please kichu mone korish na.kichu bujlam r kichu bujlam na.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: