পেনসিলের দরবারে (১)

আমার পরম বন্ধু এবং চরম শত্রু যে একটি বিষয়ে সর্বাত্মক ভাবে একমত সেটি হচ্ছে, আমাকে দেখে আপনার ভালবাসা উথলে উঠুক না উঠুক, পিত্তি জ্বলুক না জ্বলুক, আমি অত্যন্ত লজিকাল প্রকৃতির মানুষ এইটুকু স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া গতি নেই।

ঠিক সেই কারণেই, দিনকাল যা পড়েছে , এখন “পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান সোর্ড” প্রবাদ বাক্যটি শুনলেই সত্যজিৎ রায় ধরণীতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে।

পেনেরই যদি এরকম পেনফুল অবস্থা হয়, পেনসিলের হাল সহজেই অনুমেয়।

অনেক ভেবে দেখলাম , পেনসিলের অকাজ খানতিনেকের বেশি নয়।

১) পেনসিল বেশ কিছু পার্মানেন্ট লো ব্লাডপ্রেসারওয়ালা জনতার হুহু রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পেরেছে। এবং কাজটা করতে সক্ষম হয়েছে অসম্ভব এফিসিয়েন্সির সঙ্গে। সত্যি বলছি বুঝতেই পারিনি পেনসিলে হাত কাটলে কারুর কারুর এত ব্যথা হতে পারে।

২) অবাক কাণ্ডটা হচ্ছে, এর উল্টো রিয়্যাকশনটাও একই রকম সত্যি। সার্ভে বলছে পেনসিলের হিজিবিজি রেখায় হাসিটাই বেশি আসে। কখনো কখনো কান্নাও।

৩) সার্ভে আরও বলছে পেনসিল বহু প্রাণকে শান্তিতে নিদ্রা যেতে সাহায্য করে। “বাবারে। এত বাজেও কেউ বকতে পারে। আমি তো কিছুই না এর কাছে”- এই ভাবনাটাই কি আনন্দের।

কিন্তু দেশের দশের এত মঙ্গল করবো এরকম উদ্দেশ্য –বিধেয় কোনটাই আমার ছিল না। পেনসিল থেকে আমি কি কি পেয়েছি বা পাচ্ছি তার একটা খসড়া করবার দরকার পড়েছে আজ।

১)কদিন আগে এক সুদৃশ্য কৌটো পৌঁছেছে বাড়িতে। প্যাকেট খুলতেই যে গন্ধটা বেরোলো যুগযুগান্তর স্বাদ পায়নি তার নাক। যুগযুগান্তর অর্থে  চাকদা বাড়ি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম। মন্ট্রিয়লে যে কেউ বাড়িতে ঘি বানাতে পারেন সেটা যদি বা কল্পনা করতে পারি, সেই ঘি যে কেউ সেমি অচেনা কাউকে দান করতে পারেন এটা না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করা সোজা হত।  স্তম্ভিত ভাবটা কোনোরকমে কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এটা মানে কেন?”

“ঘি তুমি ভালবাসো তো খুব। ভাত দিয়ে মেখে খেয়ো একটু”।

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে কে বলল?”

“কেন? পেনসিল”-লাজুক উত্তর ভেসে আসে এক।

২) আরেকটা জিনিস নিয়ে খুব প্যাশনেট আমি। কিন্তু খুব কম মানুষ জানেন সেটা।

“ইম্পসিবল। এটা কিছুতেই নিতে পারব না আমি”।

“তোমায় তো দিচ্ছি না। এটা পেনসিলের জন্মদাত্রীর জন্য”।

কিন্তু আমি যে নিজেকে এতদিন এত কষ্ট করে “ যাবতীয় জাগতিক ব্যাপারে থেকেও উদাসীন” প্রমাণ করবার চেষ্টা চালাচ্ছি সেটা কি এই দেশী ঘি আর প্রিয় পারফিউমের সুবাসেই উড়ে যাবে?

৩) অদ্ভুদ লাগে জানেন। যখন জার্মানি, ইংল্যান্ড, দুবাই কি বাংলাদেশ থেকে মেসেজগুলো আসে, যেগুলোকে চিঠি বলতেই ভালবাসি আমি।

“জানো ইন্দ্রাণী, এবারের পেনসিল পড়তে পড়তে কি মনে পড়ে গেলো। আমি তখন একুশ। শুনবে”?

আর এভাবেই পেনসিল আমি থেকে আমরা হয়ে ওঠে।

কিন্তু এসব কথা আসছে কেন? কোথা থেকে?

উন্নাসিক ট্যালেন্টেড মানুষজন তো কখনো নিজের ঢাক নিজে পেটানোর প্রয়োজন বোধ করেন না।

জানুয়ারির শেষ দিকে ইমেল এসেছিলো একটা। বিষয়বস্তুটা এতই হাস্যকর  যে ভুলে গিয়েছিলাম দুদিনেই।

মার্চের শেষে দেখা গেলো সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারে। বিষয়বস্তু যদিও একই। কোনও এক নাম জানাতে অনিচ্ছুক প্রকাশক পেনসিল নিয়ে একটি বই বার করতে চান। আমি রাজী হলে বাকি ডিটেল পাওয়া যাবে।

ব্যাপারটা নানা কারণে ভীষণ রকম জটিল।

প্রথমত পেনসিলের বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কুখ্যাত হওয়ার কোনও পরিকল্পনা এই মুহুর্তে নেই।

দ্বিতীয়ত, আমি যে বাংলা লিখতে পারি এই ভরসাটাই কস্মিনকালে ছিল না। সুতরাং পেনসিল আমার আইডিয়া নয়। আর অন্যের আইডিয়া চুরি করে বই ছাপাবার মত গর্হিত কাজ করবার পকেটের জোর আমার নেই। মামলা লড়বার পয়সা দিতে পারব না।

কিন্তু রুমমেট ছাড়বার পাত্র নয়।

“অভদ্রতার একটা সীমা থাকা দরকার। যাই কর না কেন সেটা জানিয়ে দিতে কি অসুবিধা”?

অগত্যা ল্যাদ পরিত্যাগ করে আরেকটা ইমেইল পাঠাতে বাধ্য হই।

পেনসিল যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত তাঁকে।

কিন্তু সমস্যাটা হল, তিনি অতিশয় সাধু ব্যক্তি।

ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি, অসীম উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং পারমিশন সহ উত্তর এসে গেছে। খুবই নিরুৎসাহ, অসহায় এবং বিচলিত বোধ করি ভদ্রলোকের এই আচরণে। এই মেলটার কথা তো আর রুমমেটের থেকে লুকিয়ে রাখা যাবে না। আর এই যুক্তিটা দিয়েই এতদিন ঠেকিয়ে রেখেছিলাম তাকে।

তাই আরেকপ্রস্থ চিঠি চালাচালি শুরু হয় আবার। ময়ূখের তাড়নায়।

ওর বদ্ধমূল ধারণা মা-বাবা চলে যাওয়ার পরেই এই যে কোনো ভাল ব্যাপারে আমার এই “করছি-করব-না করলেই বা কি যায় আসে” নিরাসক্তির জন্ম।

আর সেই গোলকধাঁধা থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড ছাড়া কে আমাকে বার করবার দায়িত্ব নিতে পারে”?

চলবে

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: