কথায় কথায়

আজকের মতোই ভয়াবহ মাথা যন্ত্রণা করছিল সেদিনও।

কিন্তু বাড়ি ভর্তি লোকজন।

ময়ূখের বন্ধুরা এসেছে সবাই ওর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে।

কিন্তু মাইগ্রেন এমনই এক বস্তু যে বিন্দুমাত্র ভদ্রতা করবার অবকাশও দেয় না সময় সময়।

শাশুড়ি-মায়ের উদ্বিগ্ন দৃষ্টি, রুমমেটের “সেই আজকেই ব্যথাটাকে নেমন্তন্ন করে আনলে” মুখ পেছনে রেখে কোনোরকমে ক্ষীণ একটা “হাই” বলে চলে এসেছি শোয়ার ঘরে।

চোখে ভাল করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যেটাই মাটি।

হঠাৎই কানে সদ্য অভ্যাশ হতে থাকা গলা খাঁকারি শুনে চমকে উঠে বসেছি।

“কিছু বলবে”?

“ভাবছিলাম একটু চা করে দেব? আস্তে আস্তে খেয়ে দেখবে? সামান্য আরাম লাগতেও পারে। দাঁড়াও আমি এখুনি করে আনছি”।

গলা খাঁকারির মালিক- আমার শ্বশুরমশাই।

ভদ্রলোকের সাথে ঠিকঠাক পরিচয় ২০১৪ তে। তিনমাস দেশে ছিলাম যখন।

পরিচয়টার আলাপে পুরোপুরি গড়াতে না পারবার পেছনে কারণ ছিল অনেকগুলো।

রক্তাক্ত মন। অবিরত যুদ্ধ। অবর্ণনীয় দোলাচলকে সঙ্গী করে আর যাই হোক নতুনের দিকে হাত বাড়ানো যায় না।

তা সত্ত্বেও প্রতি শনিবার যতো কিছুই থাকুক না কেন চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে, উনি দুর্গাপুর থেকে ফিরবেন বলে।

এক কথায় খুব মজার মানুষ।

আমার বাবা যতো ধীরস্থির ছিলেন, ইনি অতোটাই ছটফটে।

সারাক্ষণ কিছু না কিছু করা চাই।

গানবাজনা অসম্ভব ভালোবাসেন। প্রচুর অনুষ্ঠান কন্ডাক্ট করেন।

এবার মন্ট্রিয়লের পুজোতে এসেও দুর্দান্ত একটা প্রোগ্রাম করে গেছেন।

কিন্তু যেটা বলতে চাইছিলাম।

এই বাবার সঙ্গে সত্যিকারের আলাপ হল এইবার, ওঁরা যখন সেপ্টেম্বরে এলেন এখানে। আমাদের কাছে।

ডিউটি ফ্রী থেকে কেনা প্যাকেটে বাবা-ছেলের হুইস্কি ছাড়াও দেখি এক দৈত্যাকায় অ্যাবসল্যুট ভদকার বোতল উঁকি মারছে।

চোখাচোখি হতেই মিটিমিটি “কি খুশি তো এবার” হাসি।

কত গল্প হয়েছে ।

সারা পৃথিবীর অনেকটাই ঘোরা হয়ে গেছে ওঁদের দুজনের। কিন্তু এই ছোট্ট শহরটা এত ভাল লেগে গেছিল হয়তো কাছের মানুষরা থাকে বলেই।

প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যে নিয়ম করে বেরিয়ে যেতেন।

আমি একদিন হাহাকার করছিলাম যে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ওজন আমার চাইতে বেশি বলে ময়ূখের ওপর এই একটি ব্যাপারে আমি বড়ই মুখাপেক্ষী।

দুদিন যেতে না যেতে দেখি রান্নাঘরের কোণে এক আদি অকৃত্রিম আহ্লাদী ফুলঝাড়ু বিদ্যমান।

আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম “এটা কোথায় পেলে”?

আবার সেই মিটিমিটি “কি খুশি তো এবার” হাসি।

অসম্ভব গোছানো প্রকৃতির মানুষ। প্রতিটা জিনিস জায়গায় থাকা চাই।

ছেলেটা যদি বাবার এই স্বভাবের এক কণাও পেতো-

যাক সে কথা।

খুব সাদাসিধে আর বড় মনের মানুষ।

কিন্তু সেটা নিয়ে তো বেশি কিছু লেখা যায় না। লেখাটা শোভনও নয় সম্ভবত।

অনুভুতিটাই থেকে যায় শুধু। শিরায়-ধমনীতে।

যে জিনিসটার জন্য আমি মন থেকে শ্রদ্ধা করি শ্বশুরমশাই-শাশুড়ি মাকে সেটা হল অদ্ভুত স্পেস দেওয়ার ক্ষমতা।

আমি যে একটু অন্যরকম- সেটা মন থেকে গ্রহণ করেছেন ওঁরা।

স্কাইপে বিবমিষা জন্মে গেছে চিরকালের মতো।

ওটা আমার কাছে দু দুজনকে শেষ বিদায় দেওয়ার মাধ্যম ছাড়া আর কিচ্ছু না।

কালেভদ্রে স্কাইপ করি।

বুঝতে পারেন হয়তো।

আমি যে ইচ্ছে না করলে কথা বলতে পারি না, কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যেতে পারি একেবারে, এরকম আরো বহু কিছু – বুঝতে পারেন হয়তো।

“তোমরা বড় হয়েছ। নিজেদের সংসার তোমরাই সবচাইতে ভালো বুঝবে। আমরা সবসময় মঙ্গলকামনা করব। আর যদি কখনো পরামর্শ চাও- পাশে তো থাকবই”- এমনটাই মনের ভাব।

জীবনে হারিয়েছি অনেক।

কিন্তু যতো বুড়ি হচ্ছি, উপলব্ধি হচ্ছে ওপরে যিনিই থাকুন, সবকিছু একেবারে কেড়ে নেন না।

প্রবল ঝড়ে- ধুলোয় প্রাথমিক ভাবে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় চোখ ফেরাতে একটু সময় লেগে যায়।

এটুকুই।

 

 

 

 

 

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. babaka poralam, bollen “Ki khusi to abar”.

    Like

  2. Upore jini thaken ….kothata khubi shotti…dhonodaad darun aro akta lekha post korer jonno

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: