চা-রু-কাহিনী

আমার মা কে নিয়ে ঝামেলা ছিল বিস্তর।

সুন্দরী মহিলামাত্রেই নাক উঁচু হয়ে থাকেন কিন্তু সেই ট্রেটটার সঙ্গে চোখ ঝলসানো স্পষ্টবাদিতা জুড়ে গেলে ব্যাপারটা বেশির ভাগ সময়েই হাতের বাইরে চলে যায়। যাবেই।

বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরেছেন মা। মুখ গম্ভীর।

ভয়ে ভয়ে শুধোই, “সব ঠিক আছে তো? দুধটা গরম করি এবার”?

বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ। আমিষ-নিরামিষ-কোনও জায়গাতেই কিছু খেতেন না, বাড়ি ফিরে একটু গরম দুধ আর একটা সন্দেশ- এটাই স্ট্যান্ডার্ড মেনু।

“হুঁ। অল্প দিস”।

দুধের গ্লাস হাতে মা-মেয়ের গুলতানি শুরু হয় অবশেষে।

“মেজাজ খারাপ কেন বলবে না”?

বিস্ফোরণ ঘটে বাক্যটি উচ্চারণ করবার সঙ্গে সঙ্গেই।

“ভাবতে পারিস? একটা বাচ্চা মেয়ে নিজের শরীরের যত্ন নেয় না”?

বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

“ইয়ে মানে কি হয়েছে একটু আলোকপাত করলে আমিও আমার মতামত দিতে পারি”।

আমার কথায় কর্ণপাত না করে একা একাই মুহ্যমান হয়ে থাকেন ভদ্রমহিলা।

“স্লিভলেস পরতে হলে যে হাতটা টোনড করবার দিকে আগে নজর দিতে হয় সেটুকু জ্ঞান নেই? ” ইস! দেখেই মাথা খারাপ লাগছিলো আমার। ত্রিশ পেরোতেই এই। আমাদের মতো বয়স হলে কি করবে? আর কেন মানুষ বোঝে না সব পোশাক সবার জন্য নয়”- হাহাকার চলতেই থাকে।

চলতে চলতেই নিজের মেয়ের দিকে দৃষ্টি যায় তাঁর।

“শোনো এটুকু ভরসা আমার তোমার ওপর আছে যে তুমি এরকম বেমানান জামাকাপড় পরে লোক হাসাবে না। সেটার মান রেখো দয়া করে”।

“সে আর বলতে। আমার জামাকাপড় দেখে লোকের চোখ কপালে উঠতে পারে কিন্তু তার চাইতে বেশি কিছু হবে না এ আমি তোমাকে লিখে দিতে পারি”।

চিরকাল এমনই বাধ্য ছিলাম আমি।

সেই মায়ের আরেকটি মহৎ দুঃখ ছিল, আমার কোনও নেশা নেই।

আপনার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার মতো কিচ্ছু বলিনি।

আই মিন চা কফি জাতীয় গরম পানীয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র আসক্তি ছিল না কস্মিনকালেও। আর এটা যে ভট্টাচার্য্য বাড়িতে জন্মে কত বড় অপরাধ ব্যাখ্যা করা ভগবানের সাধ্যাতীত। ডি এন এ টেস্ট করতে হয়নি আমার বাবার ভাগ্য।

রাত্তির বারোটা থেকে দুপুর চারটে- প্রতিটি মুহুর্তকেই চা পানের প্রকৃষ্ট সময় হিসেবে গণ্য করতেন আমার গুরু এবং লঘুজনেরা।

কফির নেশাটা হল ক্যানাডার অকহতব্য ঠান্ডা বুঝতে আর যুঝতে।

আর চায়ের নেশাটিতে দীক্ষিত করে গেলেন আমার পরম পূজানীয়া শাশুড়ি-মা। সেপ্টেম্বরে এসেছিলেন মাস দেড়েকের জন্য। কুকীর্তিটা করেছেন তখনই।

রান্নাঘরের একটা তাক এখন চায়ের কালেকশনে বোঝাই।

দার্জিলিং চা এসেছে দু ক্ষেপ।

সৌজন্যে- সূর্যদা এবং অমিতাভদা।

ল্যাবে শেষবারের সিক্রেট সান্তা তে ময়ূখের পাওয়া চা আর কুকিজ দুটোই দারুণ।

আমার আবার একটু একটু ওরগ্যানিক ওরগ্যানিক বাতিক আছে। আর সমস্যাটা হচ্ছে মিমির কানে যদি একবার যায় কিছু একটা আমার খেতে ভাল লাগছে- ফলে আপাতত যা অবস্থা বাড়িতে জেসমিন টীর একটা আউটলেট বানানো যেতেই পারে।

আমার রুমমেট আবার যখন পারছে যেখান থেকে পারছে চা তুলে আনছে।

কদিন আগে একটা ইরানী চা খেয়ে হেব্বি লেগেছে। সেইটারই সন্ধান চলছে এখন।

এখন রাত দেড়টা।

ক্লান্ত লাগছিলো খুব। ভাবলাম শুয়ে পড়বো।

কিন্তু চায়ে তৃতীয় চুমুকটা দিয়ে মনে হল এটুকু তো দেওয়াই যায়।

পেনসিলকে।

ছুঁয়ে না ফেলা অচেনা দূরত্বের  ফোটোফ্রেম থেকে ভেসে আসা হাসিটা চোখে নিয়েই পোস্ট করে দিলাম লেখাটা।

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. er porao bolchish poram pujonio.Besh mojar likhachish.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: