কেউ কি জানো সদাই কেন

শাপমুক্তির পথে। অবশেষে।

জীবনে অসম্ভবও তো সম্ভব হয় কখনো কখনো। না হলে অলৌকিক শব্দটার আর জন্ম হয়েছে কেন?

ফ্রেঞ্চক্লাসটা দারুণ লাগছে আজকাল।  সত্যি বলছি ।

প্রোফেসর লুসিয়ানোকে শুধু দেখতেই যে অনেকটা বাবার মতো তা নয়, পড়ানোর ধরণটাতেও মিল আছে বেশ।

স্কুলের বাচ্চাদের মতো সবার আগে টাস্ক শেষ করে দৌড়ে খাতা দেখানোর অব্যশটা আজও যায়নি, সেটা দেখে ওঁর মিটিমিটি হাসিটা ফিকফিকে পরিণত হয়।

কিছু ভুল করলে কখনো ঠিক করে দেন না, বাবারই মতো।

“ভাবো, ভাবতে থাকো”, এই একটা কথাই বলেন। বাবারই মতো।

আর ভাবতে ভাবতে ভুলের কারণটা যেই বেরিয়ে যায়, ফিকফিকটার অনায়াশ রূপান্তর ঘটে হো হো তে। ঠিক বাবারই মতো।

আমার চরিত্রের একটা মস্ত সমস্যা আছে জানেন।

উত্তেজিত হয়ে পড়বেন না প্লীজ। নিতান্তই নিরামিষ সমস্যা।

কোনও কিছুকে ভালবাসতে ভীষণ সময়  লেগে যায় । মানে ভাল যে বাসছি সেটাও মগজ নিতে পারে না প্রথম প্রথম। কিন্তু একবার ব্যাপারটা হয়ে গেলে প্রচুর ঝামেলা ঝঞ্ঝাট স্বত্বেও প্রেমটা টিকে যায় ঠিক।

ফ্রেঞ্চটা তাই নিঃসন্দেহে শিখে ফেলতে পারবো এবার।

যাই হোক , কাল ক্লাস শেষ করবার তাড়া ছিল একটু।

কাকু, মানে নীলেশের বাবার বাৎসরিক কাজ ছিল মঙ্কের মন্দিরে। অনেক করে বলেছিল একটু তাড়াতাড়ি যেতে পারলে ওর ভালো লাগবে।

ময়ূখ বাড়িতেই নেই, আর একা একা আধো চেনা রাস্তায় বিন্দুমাত্র ঠোক্কর না খেয়ে সঠিক পৌঁছে যাবার জন্য যে বুদ্ধিমত্তার দরকার, সেটা থেকে ঈশ্বর আমাকে চিরতরে বঞ্চিত করেছেন বলেই কট্টর নারীবাদী হতে পারলাম না এ জন্মে।  কি লোভ ছিল তকমাটাতে।

মেট্রো থেকে বেরিয়ে কল করলাম বন্ধুকে।

“ওমা তুই পৌঁছতে পারলি শেষ অব্দি, আহা কি সৌভাগ্য আমাদের”, এরকম আপ্যায়নে কান সয়ে গেছে, তাই পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করি “এবার কোনদিকে যাবো”?

প্রাণপণ চেষ্টায় বোঝাতে থাকে নীলেশ আর আরও আরও গুলিয়ে ফেলি আমি।

বন্ধুর ক্রমবর্ধমান হতাশা, আমার বিরক্তি আর মিমির হাহাকার যখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, ফোনটা ছেড়ে দিই টুক করে।

এভাবে চললে সারাদিন এখানেই কেটে যাবে।

ফোনটা রেখে লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে আরেকটা নাম্বার ডায়াল করি। বুক দুরুদুরু করছে।

এই রে।

কি করতে পারে?

সম্ভাবনা এক- ফোনটা বেজে বেজে থেমে যেতে পারে ( ফলশ্রুতি- দেখা হলে তুমুল ঝাড়)।

সম্ভাবনা দুই – কলটা রিসিভ করে ফেললেও ফেলতে পারে  (ফলশ্রুতি- দেখা হলে তুমুল ঝাড়)।

সম্ভাবনা তিন- আমার কাজটা হয়ে যেতে পারে (ফলশ্রুতি- দেখা হলে তুমুল ঝাড়)।

সুতরাং “আমি কি ডরাই কভু ভিখারী রাঘবে” টাইপ মনের জোর নিয়ে বেজেই যেতে লাগলো ফোনটা। হঠাৎ অন্য প্রান্ত থেকে “বলো” শুনে চমকে উঠেছি হেব্বি – ওটাই আমাদের হ্যালো কিনা।

“ইয়ে মানে ক্যান উই টক ফর আ মিনিট”?

কোনও ভনিতা না করে জবাব আসে  “হাঁটতে থাকো। বাঁদিকে একটা বার পড়বে। দেখতে পাচ্ছো? কিপ ওয়কিং স্ট্রেট, দশমিনিটে পৌঁছে যাবে। একটা টেক্সট করে দিয়ো। বার্গার খেয়েছি। ফেরবার সময় বাজার করে ফিরব। ছাড়ছি এখন”।

নির্বিকার ফোন রেখে দেয় সে (আর লোকে বলে আমি নাকি “ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট”)।

কিন্তু তফাৎটা এইখানেই।

কি করে যে ঠিক না বলা কথা বুঝতে পেরে যায়।

নীলেশের সঙ্গে আরও আধঘণ্টা বাতচিৎ চালিয়ে ঘেমেনেয়ে গেলেও এই বিয়র বারকে বাঁদিকে রেখে হেঁটে যাওয়ার ডিরেকশনটা আসতো না কিছুতেই।

যথারীতি আমাকে দেখেই হইহই ওঠে একটা আর কি করে পৌঁছলাম শুনে মিমির খিলখিল মন্তব্য “যে যা ভাষা বোঝে”!

কাকুর গল্প যতো শুনি প্রতিবারই নতুন লাগে, তাই বেশ কাটছিল সময়টা।  টনক নড়ল নীলেশের কটমট চাউনিতে।

“তোর কি খিদেও পায় না রে? চল। চল বলছি”।

বাক্যটি কর্ণকূহরে প্রবেশ করা মাত্রই বুঝতে পারলাম এত খিদে পেয়েছে যে এখুনি না খেলে আমি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারি।

মন্দিরের পুরোহিত খুব প্রিয়জন আমাদের। উনিই সব রান্না করেছেন।  নিরামিষ অসম্ভব ভালবাসি বলেই নয়, এরকম অপূর্ব রান্না খুব বেশি খেয়েছি বলে মনে করতে পারছি না।

মেসোমশাই আর আমার বেগুন প্রীতি সর্বজনবিদিত। চচ্চরিটা কতবার নিয়েছি হিসেব নেই কোনও।কিন্তু গন্ধরাজ লেবু দেওয়া ডাল আর শিম সরষেটা মুখে দিয়েই মন খারাপ হয়ে যায় খুব। রুমমেটটার জন্য।

এর কাছে বার্গার?

মনের কথাটা ধরতে পেরেই বুঝি বকে ওঠে নীলেশ।

“অনেক খাবার আছে। রাতে ময়ূখের জন্য নিয়ে যাবি সব। এখন ভাল করে খেয়ে নে দয়া করে”।

খাচ্ছি ,হাসছি, গল্প করছি কিন্তু  মিমির মুখে সাংঘাতিক অচেনা গম্ভীর রেশটা দেখছি থেকেই  যাচ্ছে।

কি যে তখন থেকে দেখছেন এত কে জানে?

একসময় ভেসে এল প্রশ্নটা “হোস্টেল থেকে বাড়ি আসতিস যখন মা তোকে সবচাইতে বেশি কি খাওয়াতেন রে”?

“পালংশাকের ঝোল তরকারি”, বিরস মুখে উত্তর দিলাম।

“হুম” বলে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়লেন ভদ্রমহিলা।

মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে আমিও ঘাঁটাই না আর।

আজ সকাল থেকে শুরু হয়ে গেছে।

“শোন ময়ূখ বাড়ি থাকলে ওকেই কথাটা বলতাম। আমি তোকে এরকম কক্ষনো দেখিনি। কাল সকলের ভেতর পুরো সাদা লাগছিল তোকে। পেপার হোয়াইট।  হিমোগ্লোবিন ভয়ংকর নেমে গেছে আবার। এই জন্যই মা তোকে পালংশাক খাওয়াতেন।

দেশে গেলি যেবার তোর শাশুড়ি-মা কি কি খাইয়েছিলেন মনে কর সেগুলো এক এক করে। ব্লাড কাউন্ট কত ভাল হয়েছিল মনে আছে? অ্যানিমাল প্রোটিন তো তোমার গলা দিয়ে নামবে না। ফ্রোজেন স্পিনাচ আনতে বলতে হবে ছেলেটাকে। তোদের ওদিকে না পাওয়া গেলে আমি কিনে পাঠাচ্ছি”।

মানুষ বদলায়।

দেশ বদলায়।

সময় বদলায়।

একই থেকে যান মায়েরা।

 

 

 

 

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. oooonek din por lekha pore khub bhalo laglo. kintu last portionta chintai fello. raw banana ,palong sakh,banana,cornflakes agulo roj khawar talikai include kor.nijer jotna nish bhalo thakish.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: