এমন দিনে তারে বলা যায়

কি আর বলা যায়। মানে কি আর লেখা যায়। মানে দুটোর কোনোটাই করবার মুখ নেই কিনা এই মুহুর্তে।

পুজো পরিক্রমা (১) কোনোমতে জন্মানোর পর জীবন পরিক্রমায় এমনই নিমজ্জিত দশা হয়েছে যে পেনসিলের ভেন্টিলেশনে যাওয়াটা ঠেকানো যায়নি কিছুতেই।

এখনও এই জন্মদিনটা না এলে, আর তার সঙ্গে রাশি রাশি শুভেচ্ছার মোড়কে জড়ানো অভিযোগ অনুযোগ ভর্তি লিস্টিটা এসে না পৌঁছলে পেনসিল আবার কবে নিঃশ্বাস নেওয়ার অবস্থায় ফিরত  বলা যাচ্ছে না।

কারণ?

জীবন চলছে না আর সোজা পথে।

তার অর্থ এই নয় যে চোখের সামনে চুলচেরা রাস্তাটা হঠাৎ কথাবার্তা নেই আমাদের ছোটো নদীর মতো বাঁক নিয়ে নিয়েছে।

সত্যিটা হচ্ছে যতদিন যাচ্ছে সংসার বড় জটিল করে বেঁধে ফেলতে চাইছে।  অসম্ভব সময়াভাব দেখা দিয়েছে। কিছুতেই কিছু ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। দিনের শুরু আর শেষ হয় একটাই ভাবনায়, চব্বিশ ঘণ্টাটা যথেষ্ট নয়।

যাক সে কথা।

অনেক ভেবেচিন্তে মনে হল এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় আর যাই হোক পুজো পরিক্রমা (২) লেখবার বুকের জোর আমার নেই।

জন্মদিনটা এলেই এই সর্বহারা টাইপের ফিলিংটা হতে থাকে থেকে থেকে। কি হবে? হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে বয়স।

হৃদয়বিদারক দীর্ঘশ্বাসসহ একামেবাদ্বিতীয়ম রুমমেটকে বক্তব্যটা জানালাম। সে প্রথমে ভ্রূ কুঁচকে, মাথা চুলকে ভাববার চেষ্টা করলো খানিকক্ষণ। তারপর বিষয়টার গুরুত্ব বিবেচনা করে অর্ণব গোস্বামীকে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল “হ্যাঁ কি যেন বলছিলে”?

আড়াই মিনিট ব্রেকের পর নিজেই খুঁজে পেল উত্তরটা।

“হ্যাঁ বয়স তো বাড়বার জন্যই। তুমি তো আর কাকেশ্বর কুচকুচেকে চেন না আফটার অল”।

দিনের দ্বিতীয় হৃদয়বিদারক দীর্ঘশ্বাসসহ সম্মতি জানালাম।

“বুড়ো যখন হতেই হবে দেরি করে কি হবে খামোখা? প্ল্যানটা করে ফেলি”?

“নিশ্চয়ই”, ভয়াবহ উত্তেজনা ও উৎসাহ নিয়ে দৌড়ে লুকনো ডায়রিটা পাশের ঘর থেকে নিয়ে আসে ময়ূখ।

“প্রথমেই ভেবে দেখো ঘর কটা দিয়ে শুরু করতে চাও”?

একটু কিন্তু কিন্তু করে বলি, “কুড়িটা মতো দিয়ে শুরু করা যাক? তারপর চাহিদা বুঝে ব্যবস্থা। সেটাই ঠিক হবে না?”

“কুড়িটা”? আর ইউ ক্রেজি”?- পার্টনারের এরকম আর্তনাদে খুবই লজ্জিত হয়ে পড়ি।

“তোমার যা ট্র্যাক রেকর্ড কুড়িটার জায়গায় দুশো কুড়িটাও কিস্যু না। তারপর আবার সনু, রিঙ্কির ক্যান্ডিডেটগুলো ঢুকবে। আমার তো হাতে গোণা কটি, তুমি কি তাদের ওয়েটিং লিস্টেই রেখে দিতে চাও”? – অভিমানে টলটল করে ওঠে ময়ূখের চোখ।

রাগ-চেঁচামেচিকে ম্যানেজ করে দেওয়ার স্কিল আমার চিরকালই ছিল কিন্তু কাছের মানুষের অভিমান বড় নড়বড়ে করে দেয় ।আজও।

ড্যামেজ কন্ট্রোলে তড়িঘড়ি নামতে হয় অগত্যা।

“না না সে কি কথা! তোমার ক্যান্ডিডেটদের জন্য তো লটারিও থাকছে না। এলেই ভর্তি। হ্যাঁ খরচা চালানোর ক্ষমতাটুকু থাকতেই হবে। সেখানে কোনো ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এটা ভুললে চলবে না, যে সার্ভিস দিচ্ছি আমরা, এমনটি আর পাওয়া যাবে না”।

ভীষণ খুশি হয়ে ডাইনে বাঁয়ে মাথা দোলায় ময়ূখ।

যে কোনও আলোড়নকারী আইডিয়ারই জন্মমুহুর্ত অতীব নগণ্য হয়ে থাকে, এই তথ্যটি আমার যথেষ্ট পরিমাণে জানা আছে। তাই ঠিক কবে কখন এই ভাবনাটা মাথায় এসেছিল সেটা মনে করবার অক্ষম প্রচেষ্টা চালাই না বিশেষ।

মোদ্দা কথা, গল্পটা হচ্ছে এইরকম।

আমার কথাই যদি বলি।

ময়ূখকে আমি বিয়ে করেছি না ময়ূখ আমাকে বিয়ে করেছে নাকি বিয়েটাই আমাদের ইয়ে করেছে সে তর্ক থাক কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, বিয়েটা হওয়ার আগেও বহু জনতার আমার ওপর ব্যথা ছিল, আমারও দু একজনকে দেখলেই হার্টবিট মিস হতো, বিয়ের পরেও যে হয়নি-হবে না বলবার মতো পারফেক্ট উওম্যান আমি হতে চাই না কোনোদিন।

এরকম ব্যথা আছে-ছিল-থাকবে-থেকেও নেই-হলেও হতে পারতো –না হয়েই কি ভাল হল- ওরে বাবা হলে কি হত কেস আমাদের সকলের আছে, ছিল, থাকবে।

এর পরের প্রশ্নটা হচ্ছে, যে গল্পগুলো অর্ধেক হয়ে থেমে গেছে অথবা গল্প হয়ে ওঠবার সুযোগই পায়নি, সময় তাদের নিয়ে কি খেলা খেলেছে পলক উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করাটা কি খুব বেখেয়ালি ইচ্ছে?

জীবন তো একটাই।

তাই আমরা ঠিক করেছি, একটা হৃদয় খুঁড়ে দেখবার ঠিকানা খুলবো। পঞ্চাশ ছুঁলেই।

আইডিয়াটা খুলে বলতে একসাথে নেচে উঠেছিলো আমার তিন সবচাইতে বিশ্বাসযোগ্য কমরেড।

তিনজনই প্রমাণ করে দিয়েছে, বারেবারে “রাজদ্বারে, শ্মশানে চঃ যঃ তিষ্ঠতি সঃ বান্ধবঃ”। ময়ূখ ,সনু, রিঙ্কি।

আমাদের এই ঠিকানায় ভর্তি হওয়া অত্যন্ত সহজ।

ক্রাইটেরিয়া নাম্বার ওয়ানঃ

-আপনাকে আমাদের চারজনের যে কোনও একজনের পাস্ট-প্রেজেন্ট-ফিউচার (ফিউচারটা এই জন্যই ইনক্লুড করা যাতে আপনি নিজেকে অবহেলিত না ভাবেন।) দুর্বলতা হতে হবে। মনে রাখবেন আমরা ধরিত্রীমাতার বিচ্ছিরিতম নাকউঁচু প্রাণীদের মধ্যে অগ্রগণ্য, আমাদের আইসক্রিম সম গলিয়ে ফেলা আর গাণ্ডীবের সেকেন্ডহ্যান্ড এডিশনের খোঁজ পাওয়া প্রায় একই ব্যাপার।

ক্রাইটেরিয়া নাম্বার টুঃ

-পয়সা থাকতে হবে। বাক্যটি সাংঘাতিক নীচমনার মতো শোনালেও কিছু করবার নেই।

ভাবুন তো সন্ধ্যের প্রাক্কালে মৃদুমন্দ বাতাস মেখে পায়ের কাছে লুটোপুটি করছে সূয্যিমামার পাটে বসা রাঙ্গা ছায়া, আর চিল্ড বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে কেন স্টোরি অফ ফিলোসফিটা দুনিয়ার তাবৎ মানবজীবনের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেওয়া দরকার, সেই অমূল্য বাণীটি বিতরণ করছেন, সদ্য আঠারোয় পা রেখে হাজারবার লিখেও চিঠিটা দিতে পারেননি যার হাতে, তাঁকে! অথবা বরফঠান্ডা ঘোলের শরবৎ হাতে “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়” গুণগুণ করবার দূর্লভ আয়েশটুকু?

অ্যাঞ্জাইনার ঝিম ধরা বুকের চিনচিনে, ঝনঝনে ভাব উড়িয়ে দেওয়া , ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই তো এত কিছু।

একি অল্প পয়সায় পাওয়া সম্ভব না কি পেলে ভাল হত?

কিন্তু এদিকে একটা মুশকিল হয়েছে।

গল্পটা শুরু না হতেই বাকি তিনজনের যা গদগদ দশা, এ কর্মযজ্ঞেরর সিংহভাগটাই আমার ঘাড়ে পড়বে সে আমি সম্যক বুঝতে পারছি।

ঠিক আছে। সে না হয় সামলে নেওয়া যাবে।

আমাকে নাকানিচোবানি খেতে দেখেও নির্বিকার বসে থাকতে পারেন এরকম বীরচিত্ত ওয়াই ক্রমোজমের দেখা পাইনি এখনো।

ময়ূখের মুখচোখ দেখলে আজকাল অতিবড় শত্রুরও মায়া হবে।

“ ইস পঞ্চাশ হতে আর কত দেরি”!  সারাক্ষণ ছটফট করে বেড়াচ্ছে ।

যতো বলছি “ওরে এবার একটু চাকরি বাকরি মন দিয়ে করে দুটো সংস্থান কর, টাকা না থাকলে প্ল্যানটাই তো লাট খেয়ে যাবে”- শোনে আর উদাস হয়ে জানলার বাইরে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা নেড়ামুন্ডি গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

সেদিন হোয়াটস অ্যাপে ফাইনাল আলোচনাটা সেরে রাখতে যাচ্ছি সবে, হঠাৎ “এই এই” করে ওঠে সনু।

“সবই তো বুঝলাম। কিন্তু জায়গাটা হবে কোথায়? ক্যানাডা বলিস না প্লিজ। আত্মহত্যা করতে হবে”।

“রাম কহো। মরতে ক্যানাডায় জায়গা দেখতে যাব কোন দুঃখে? শেষে সবকটা নিউমোনিয়া হয়ে মরুক!”

“এই চিন্তাটা এল কি করে তোর মগজে? সূতানুটী আছে কি করতে”? -মর্মান্তিক আহত হই আমি। সত্যি সত্যি।

“কিন্তু কি করে হবে? কোথায় হবে? বাড়িটাও তো বিক্রি করে ফেলেছিস”?

হ্যাঁ। এটা একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছেই।

ভাবছি  ব্যানার্জি দিদিকে বললে কিরকম হয়?

জাস্ট একটু জমি –ই। দুই বিঘার দেড় শতাংশও নয়।

কনসিডার করবেন না?

বঙ্গবিভূষণ- টুষণ তো হতে চাইছি না আর।

 

আর হ্যাঁ মনে রাখবেন আমাদের কোনো শাখা নেই।

 

 

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. 3ta pagli r 1ta pagoler mostokai ai sob buddhi ashe. chalia jao amra sathe achi

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: