আজ নিশীথে

লোকজন আমার ওপর আজকাল খুব বিরক্ত। মানে এটা নতুন কিছুই নয় কিন্তু বিরক্তির মাত্রাটা দিনদিন বাড়ছে আর কি।

আমাকে নাকি ফোন করে পাওয়া যায় না। কথাটা মিথ্যে বলছি না কিন্তু সে তো কবেই বলে দিয়েছি নিতান্ত মরমর অবস্থা না হলে ফেসবুককে আমি নিরাশ করি না। কিছু বলবার থাকলে ওখানে বলো। তৎক্ষণাৎ না হলেও কোনও না কোনও সময়ে ঠিক জবাব পেয়ে যাবে। তক্ষুনি তক্ষুনি উত্তর দিতেও পারি কিন্তু তার জন্য তোমাকে বিচ্ছিরি ইম্পর্ট্যান্ট হতে হবে। কিন্তু সে সংখ্যাটা তো কড়ে আঙুলেই গুণে ফেলা যায়।

সে জনগণের মগজে ঢুকলে তো ? তারা ফোন করবে, করবেই। অবধারিত সাড়া পাবে না আর তারপর আমার চতুর্দশ পুরুষকে রেগুলার বেসিসে ডাকাডাকি করবে।

কি করে বোঝাই ফোন জিনিসটাই আমার পছন্দ নয়। আমি ওই বস্তুটা থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে চাই শুধু গোলমাল এড়াবো বলে।

এই তো সেদিন কি কাণ্ড।

গত রবিবার ভোরবেলা। বাড়িতে দারুণ ছুটোছুটি। পুরো পাগলদের দল কিউবেক সিটি যাবে। “এরা বেরিয়ে যাবে আর আবার ঘুমোবো” এই ভাবনাটা যে কি ভয়ানক মানসিক প্রশান্তি নিয়ে আসে, যে জানে সে জানে।

অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি, তিনটে মিসড কল আর অগুন্তি বার্তা- এক এক করে পড়ছি আর উল্টোদিকে সাংঘাতিক উদ্বিগ্ন সনুকে দেখতে পাচ্ছি।

আমি নাকি মধ্যিরাত্তিরে বারকয়েক ওকে কল করেছি, স্বাভাবিক ভাবেই খুব ভয় পেয়ে গেছে মেয়েটা।

কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, “জানি না তো কি করে হয়েছে। আমি কিছু করিনি, আমার ফোনটাই তোকে মিস করছিলো নিশ্চয়ই”।

কেলেঙ্কারি আমার জীবনে অহরহ হয়েই থাকে কিন্তু সেগুলো আরেকটু অন্যরকম। আর তাদের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে দায়ী ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য। বলা নেই কওয়া নেই, ভুল লোককে ভুল মেসেজ পাঠিয়ে দেবার ভগবানদত্ত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন ভদ্রমহিলা।

রিহার্সাল চলছে হু হু করে। তিনি রেকর্ড করছেন সবকিছু অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে। এটা ইমেল করে দিলেই হবে সকলকে।

নিজেকে ইমেল করতে ভুল হয় কারুর কখনো?

পৃথিবীর কোনও প্রান্তে আরেক ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য সেই ভিডিও রেকর্ডিং নামক অতুল ঐশ্বর্য অকস্মাৎ লাভ করবার ডিপ্রেশন কি মহিমায় অতিক্রম করেছিলেন বা আদৌ করে উঠতে পেরেছিলেন কিনা আতংকেই জানবার চেষ্টা করে উঠতে পারিনি আজ অব্দি।

সদ্য শেখা গাজরের মিল্কশেকের রেসিপি নির্বিকার চিত্তে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম আরেকজনকে। সে ভদ্রলোক আমার কাজকর্মের সঙ্গে অত্যধিক পরিচিত হওয়ায় দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজটা সেবারের মতো শুনতে হয়নি।

মানে আমি নিজেই জানি না ঠিক কি হয়। প্রতিবার সেন্ড বাটনটা ক্লিক করবার পরেই ম্যাসাকারটা গোচরে আসে আমার। এক মুহুর্ত আগে হলেই যেটা এড়ানো যেতো।

বন্ধুরা জানে। পুরনোরা আবার নতুনদের বলে দেয়। এভাবেই চলছে।

আমার ভীষণ দুঃখ হয় ভাবতে যে এই ভুলগুলো সবকটি সজ্ঞানে করা।

কারণ আমি খুবই নিয়মনিষ্ঠ একজন মানুষ। ভদকা, জিন, রাম, বিয়ার, তীব্র শুটার যাই হাতে থাকুক না কেন, জলপথে বিচরণ করা অবস্থায় একটি বাক্যও কক্ষনো কোত্থাও কাউকে লিখিনি আমি। লিখবও না।

লিখলেও খুব একটা ক্ষতি নেই যদিও কারণ নেশা আমার সে অর্থে হয়না কোনোদিন। নেশা করবার জন্য খাইওনা।

আচ্ছা একটা মেয়ে মদ খাওয়া, নেশা এইসব নিয়ে কথা বললে খুব বখাটে বখাটে শোনায় কি? আমি ঠিক জানি না।

জীবনে প্রথম সিগারেটে টান দিয়েছিলাম বাবার থেকে। সেই প্রথম সেই শেষ। জাস্ট ভালো লাগেনি।

“ওয়াইন ছাড়া অন্য কিছু না খেলেই ভালো। চেষ্টা করিস না খাওয়ার”- মা বলতেন সন্তর্পণে। বাবা এত আহত হতেন যে কোনোদিন কিছু বলেনইনি।

এক বন্ধু চলে গেছে কয়েকদিন হল। মৃত্যু আর হতবাক করে না আজকাল। এমনও নয় যে খুব যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ও, ওই আমাকে প্রথম ভদকা খাইয়েছিল।

এরপর থেকে যতদিন অন দ্য রকসে চুমুক দেব ফোঁটা ফোঁটা বন্ধু থেকে যাবে গ্লাসের নীচে। আমি জানি। মনে পড়বে। প্রতিবার।

গতবছর কলকাতা। ফিরে আসবার আগে একটা পার্টি তো করতেই হয় বন্ধুদের সাথে। আবার কবে দেখা হবে। ভাস্কর চলে এল দিল্লী থেকে। ওঙ্কার-নেহা। কল্পিতাকে খুব মিস করেছিলাম কিন্তু মাসি হয়ে যাব আর কটা দিন গেলেই ফিলিংটাও যে অপূর্ব ।

ঠিক হল কারুর বাড়িতে হাঙ্গামা করে লাভ নেই। তার চাইতে হিন্দুস্থান ইন্ট্যারন্যাশনালের জান কয়লা করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ভাস্কর বাকিদের ছোটবেলার, আমার বুড়োবেলার বন্ধু। কিন্ত সত্যিকারের বন্ধু। যখন টরন্টোতে ছিল, দেখ তো না দেখ চলে আসতো, বন্ধনটা তখনকারই।

হা হা হি হি বকবকানি চলছেই। হঠাৎ চোখ পড়লো টেবলে রাখা একটা গোলাপি বোতলের ওপর। আর সে কি গোলাপি! মুজতবার বন্ধু অস্কারকে মনে আছে? ওর চোখের সামনে যে গোলাপি হাতির সারি চলতো তাদের চাইতেও গোলাপি, আমি বাজি রাখতে পারি।

অন্বেষণে জানা গেলো, ওটা ওঙ্কার-নেহা নিয়ে এসেছে। ভদকাই কিন্তু মেড ইন পন্ডিচেরি। সবার নীরব অসম্মতি উপেক্ষা করে এক চুমুক দিলাম। বাহ! ভদকার মতো না হলেও বেশ সিরাপ সিরাপ খেতে তো!

এরা এত নাক উঁচু! মেড ইন পন্ডিচেরি বলে যেনও মানুষ নয়। মিনিট দশেক পরেই মনে হল, একটু বসি। বয়স হচ্ছে, এখন আর এত লাফালাফি পোষায় না। কিন্তু এরকম তো আমার ঠিক লাগেনা কখনো! নাহ। গরমের কলকাতা আর সত্যিই দেখছি সহ্য হয় না।

সামনেই ভাস্করের বিয়ে। আসতে পারা যাবে না কিছুতেই, ওঙ্কার আবার অজানা সমুদ্রে ভাসবে- এসব নিয়েই মূল্যবান মতামত আদানপ্রদান হচ্ছে। হঠাৎ শুনলাম কে যেন আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেবে বলে চেঁচাচ্ছে।

কে রে? ওমা দেখি ভাস্কর। হ্যাঁ। ভাস্করই তো।

আনন্দে গর্বে চোখে জল প্রায় আসে আসে আমার। একেই বলে আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে-কথায় না বড়ো হয়ে—

দেখেছো? দিল্লী পৌঁছে ক্ষান্তি তো দেয়ইনি উল্টে কি উচ্চাশা? একেবারে আজাদ হিন্দ ফৌজ?

কবে জয়েন টয়েন করছে, কোথায় পোস্টিং এসবও জিজ্ঞেস করবো ভাবছিলাম কিন্তু কিরকম যেন এনার্জি পাচ্ছিলাম না।

থাক পরে জেনে নিলেই হবেক্ষণ।

হোটেলের বাইরে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে বুঝলাম ওরা কোনও এক আজাদ হিন্দ ধাবার চিকেন তড়কার কথা বলাবলি করছে।

যাক গে। অরবিন্দের জায়গার ভদকা বলে কথা, নেতাজীর কাছে নিয়ে যেতেই পারে। নিজেকেই স্বান্তনা দিয়ে নিলাম খানিকটা।

অথবা চার পূর্ণবয়স্কের সেই রুদ্ধশ্বাস আলোচনা?

মাউন্ট রয়্যালের রাস্তাটা ওপরে যাচ্ছে নাকি নীচে নামছে- রাশিয়ান রুলেটের নাভিকুন্ড জ্বালানো দুরন্ত রং না থাকলে হতো কোনোদিন?

আজকাল খুব লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেছি। সর্বদাই চেষ্টা করি না করবার। কখনো ইচ্ছেটা জেতে, কখনো আমি।

আর যখন কেউই জেতে না কেউই হারে না, তখন?

বন্ধুটা ফিরে ফিরে আসে। ফোঁটায় ফোঁটায়।

আহ। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্বটা হয়েছিলো কি করে বলা হয়নি যে।

একটা ভুল মেসেজের সৌজন্যে।

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: