শুধু যাওয়া আসা

“এক- তিন-চার-আট-দশ- বারো”!

আপন মনে ভ্রূ কুঁচকে গুণতে গুণতে থমকে যেতো ছোট্ট মেয়েটা।

পুজো তো মেরেকেটে মোটে পাঁচদিন, এতগুলো নতুন সুন্দর সুন্দর জামা নিয়ে সে এখন করে কি! দুই মাসি, দুই পিসি, কাকারা, ঠাম্মা, দিদা, মামারা কারুর মনেই কি দুঃখ দেওয়া যায় ? এর মধ্যে কতোগুলো যে পুজোর মধ্যে পরাই হবে না তার বেলা? কাকে ছেড়ে কাকে রাখি, প্রতি বছর তাকে এই বিষম বিড়ম্বনায় ফেলে দেন বড়রা।

মা- বাবার দেওয়া ড্রেসটা অষ্টমীতে মাস্ট এটুকুই শুধু জানত মেয়েটা।

তারপর পুজোর দিনকটা ? সেকি টেনশন বাবারে।

পাড়ার একটা বন্ধুরও তার চাইতে আধখানা বেশি ঠাকুর দেখে ফেলবার সামান্যতম সম্ভাবনা দেখা দিলেই অভিমানে ঠোঁট ফুলত তার।

ছেলেধরাদের কি পুজোর ছুটি থাকে ? সেটা একবার জানতে পারলেই সব মুশকিল আসান। একা একা এই কলকাতার সব প্যান্ডেলই তখন ঘুরে আসতে পারে সে, কিন্তু মা বাবা ছাড়লে তো?

দুর্গা মায়ের একি অবিচার! এই পরাধীনতা আর যে সয় না!

দিন চলে যায়। ফিরে ফিরে আসেন মা দুর্গাও।

“অতোগুলো জামা? তোমরা কি পাগল হয়েছ? কতোলোকের একটাও জামা হয় না জান? খবরদার আমার জন্য কিচ্ছু কিনবে না। কি ভীষণ লজ্জা করে আমার! টাকা দাও আমি দরকার মত বই কিনে নেব।”

সেই সদ্য ষোড়শীর অনুযোগ পলকে উড়িয়ে দিয়ে বড়পিসি বলে ওঠেন “ সেটা বললে তো হয় না। বছরকার দিন, আমাদের মেয়েকে আমরা কি দেব, তুমি বলবার কে। ইচ্ছে না হলে পরো না”!

আর সেই অফুরন্ত ভালবাসার কাছে আবারও হার মানতে হত মেয়েটাকে।

ততদিনে মা-বাবার হাত ছাড়িয়ে ম্যাডক্স স্কোয়ার পৌঁছে যাবার সময়।

“অমন করে দেখে কেন ও?”

বুঝতে পারে না ওকে দেখলেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে মেয়েটার? চোখের পাতা কাঁপে তিরতির। হাজার মানুষের দমবন্ধ ভিড়, বন্ধুদের ননস্টপ হাহা হিহি কিচ্ছু কানে ঢোকে না আর। চরাচর জুড়ে জেগে থাকে সেই পালক ছোঁয়া দৃষ্টি আর নিজের বুকের নিরন্তর লুব-ডাব। নাকি সব বোঝে বলেই অমন করে?

দিন চলে যায়। ফিরে ফিরে আসেন মা দুর্গাও।

জীবনের মানে বদলে গেছে আরো অনেকখানি। মনের জানলা ধরে উঁকি দেওয়া সেই চোখের ভাষাও মিলিয়ে এসেছে কোথায়।

থেকে গেছে শুধু বাগবাজারের সন্ধিপুজো। মনে হয় এই তো সেদিন।   ধূপ-ধোঁয়া-গর্জনতেলে উদ্ভাসিত মায়ের মুখ আর বাবা মায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি, এই ছবিটার কোন ক্ষয় নেই।   দেশ, কাল, শোক , ব্যথা সব ছাড়িয়ে এই মুহূর্ত টুকু আজীবন থেকে যাবে আমার বুকের ভেতর। আদি অনন্ত যুগ ধরে।

দেশ ছেড়েছি। কলকাতার বাড়িটা নেই আর। মা বাবাও হাত ছেড়ে দিয়েছেন চিরকালের মত।

এ এক নতুন পুজো।

জামাকাপড় কেনবার কথা মনেও আসে না আর।

কিন্তু কেন জানি না দেবীপক্ষ পড়লেই চোখে জল আসে একটু একটু। কিন্তু নিজেকেও বুঝতে দিই না সেটা। বড় হয়ে গেছি কিনা।

রেকর্ড করা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মহালয়ার সুর ছিটিয়ে দেন মন্ট্রিয়লের এই অ্যাপার্টমেন্টেও।

এখন এখানে ফল। মেপল পাতাগুলো রঙ বদলায় ক্ষণেক্ষণে। ভিজে বাতাসের গুনগুন। আর শহর ছাড়িয়ে চোখ রাখলেই দুধসাদা কাশফুলের সারি।

খুব ব্যস্ততায় কাটে এখনকার পুজোটা। বেঙ্গলি ক্লাবের কাজ,রিহার্সাল। মনে হয় যেন নিমেষে চলে এল দশমীর সিঁদুর খেলা।

দিন চলে যায়। ফিরে ফিরে আসেন মা দুর্গাও।

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: