এই আকাশে

সংসারে থাকা আর পাঁচটা স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর মত আমার মা বাবার মধ্যেও এটা ওটা নিয়ে মাঝেমাঝেই ঘনঘোর খিটিমিটি লাগতো। কিন্তু একটা বিষয়ে অসম্ভব ঐক্যের পরিচয় রাখতেন দুজনেই। ক্রেডিটটা অবিশ্যি আমারই। জীবনে যে আমার বিশেষ কিছু হওয়ার নয় এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখবার অবকাশ আমি  তাঁদের কখনোই দিইনি।

“অতিরিক্ত ছটফটে স্বভাবের জন্যই এ মেয়ের কিছু হওয়া অতীব দূরহ, কোনও একটা জিনিসে মন নেই। সবকিছু করতে হবে। এই করতে গিয়ে কোনোটাই যখন হবে না তখন বুঝবে ঠেলা”, বলতে বলতে দুঃখে দিনে নিদেনপক্ষে বাইশ বার চা খেতেন মা।

সত্যিটা কিন্তু একেবারেই সেরকম ছিল না। তখনও না। এখনও না।

ঘটনাটা হচ্ছে আমি একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে ভালোবাসি। কিন্তু তা বলে অন্যের ওপর অত্যাচার করি না কক্ষনো। খুব নরম মনের মানুষ কিনা, তাই আমি নিজেই নিজের গিনিপিগ।

কদিন আগে পার্লারে গেছি, চুলটা একটু ট্রিম করাবো বলে। মন্ট্রিয়লে বাড়ি কেনা যে ক্রমশঃ কি কঠিন হয়ে পড়ছে তার করুণ বর্ণনা শুনতে শুনতে চোখে প্রায় জল আসে আসে, হঠাৎ মনে হল “আচ্ছা এরকম করলে কিরকম হয়”?

প্রস্তাবটা শুনেই আঁতকে উঠলেন মহিলা, “তুমি শিওর”?

ঘাড় দুলিয়ে একটা প্রবল হ্যাঁ বলাতেই দৃষ্টি করুণতর হয়ে এলো তাঁর “দেখো বাবা পরে কিন্তু আমায় দোষ দিতে পারবে না”।

আধঘণ্টা পর যখন পার্লার থেকে বেরোচ্ছি মনেই করতে পারছিলাম না মাথাটা শেষ কবে এত হালকা লেগেছে।

বন্ধুদের হ্যাং ওভার আর কাটতেই চায় না “ কি রে তুই? দেখতে তো ভালোই লাগছে কিন্তু দিস ইজ টু মাচ! অত লম্বা চুলগুলো! ইস!”

ভ্রূক্ষেপ নেই একমাত্র মিমির।

“চমৎকার দেখাচ্ছে! তোকে এরকম চুলেই বেশি মানায়। কিন্তু তোর বাবার খুব আপত্তি ছিল বলে তোকে চুল বেশি ছোটো করতে বিশেষ উৎসাহ দিই না”।

বাবাকে নিয়ে এই ছিল এক মহা মুশকিল। আরে মানুষ চুল নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করবে না তো কি নিয়ে করবে? আজ ছোটো আছে, কাল হু হু করে বেড়ে যাবে। চুলের ধর্ম চুলের, আমার ধর্ম আমার। সে কথা বুঝলে তো।

চিৎকার চেঁচামেচি একেবারেই স্বভাববিরুদ্ধ ছিল কিন্তু চুল কাটা উপলক্ষে মেয়ের সঙ্গে অন্তত এক সপ্তাহ কথা বন্ধ থাকতো। প্রতিবার। অথচ কেসটা কিন্তু বিলকুল এর উল্টোটা হওয়ার কথা। বাবা কলকাতায় থাকলে রবিবারের বারবেলাটা ছোটবেলায় প্রায়শই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াত বাবার মেয়ের জন্য।

শনিবার সন্ধ্যেবেলা ঘুরে ঘুরে যাবতীয় অকাজের জিনিসপত্র কিনে আনা হয়ে গেছে। মা বকুনি হাহুতাশ করে ক্লান্ত। সকালে বাজারের নাম করে যতো রাজ্যের উৎপটাং শখ মেটানোও খতম। সে বস্তুসমুহ উদ্ধার করতে কমলা পিসি শকে পাথর। তাহলে ঝলমলে রবিবার দুপুরগুলোর জন্য আর থাকলো কি? মেয়ের মাথাটা ছাড়া ?

অতএব বাবা আমার চুল কাটবেন। চুল কাটবার মতো অবস্থায় পৌঁছক না পৌঁছক, স্কুলে বন্ধুদের মিটিমিটি হাসি দেখে অপমানে কান লাল হয়ে যাক না যাক, মায়ের শত অনুরোধ- রাগারাগি অগ্রাহ্য করে বাবা আমার চুল কাটবেনই।

“বাবা প্লিজ! আর না”!

বললেই মুখটা এমন হয়ে যেতো, আমি গলে টলমল।

“খুব খারাপ চুল কাটো তুমি বাবা। কেন যে বুঝতে চাও না”।

“এবারেরটা বেস্ট হবে দেখবি। কাল রাত্রে কতোগুলো বই থেকে রিসার্চ করেছি জানিস? লেটেস্ট সব কাট জেনে গেছি। তুই ভরসা তো করে দেখ। ফর ওয়ান লাস্ট টাইম”।

মা বলতেন “একটুও নালিশ করতে আসবি না আমার কাছে। বাবার মুখ দেখে প্রতিবার তুই ই তো পারমিশন দিয়ে দিস”।

কোনও এক আইসক্রিমের পুরনো বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম বড় হয়ে, মেয়েটার চুলের সদ্য বিদঘুটে ছাঁট, চোখ ভর্তি জল, সামনে অনুতপ্ত বাবার হাতে আইসক্রিম, এ একেবারে অক্ষরে অক্ষরে আমার জীবনের গল্প।

দেখতাম আর অবাক হয়ে ভাবতাম বাবা কি আমাদের গল্পটা লুকিয়ে লুকিয়ে বলে দিয়েছেন যাঁরা বিজ্ঞাপন বানান তাঁদের?

বাড়ির কাছেই অনন্যা পার্লার জন্ম না নিলে আমার দূর্দশা যে আরও কতদিন চলতো, সে হিসেব মেলানো খুব কঠিন।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার চুলের ওপর যে অসম্ভব অবিচার তিনি করেছেন সেটা উপলব্ধি করবার তীব্র অপরাধবোধ থেকে পরবর্তীকালে চুল কাটলেই অত দুঃখ পেতেন বাবা!

কাছের মানুষরা বলতেন “কিন্তু তোর এ রোগ যাবার নয়। বাবার মুখের এক্সপ্রেশন দেখেই যেরকম ডিসিশন বদল করে ফেলিস!”

সেটার এক আধটা ভালো দিক ছিল তো বটেই।

রেজাল্ট খারাপ করলে “নিজের কি হবে”, “মা খেপে লাট হয়ে যাবেন” এর চাইতেও “বাবা কষ্ট পাবেন” ভাবনা থেকেই খুব খারাপ নাম্বার পাবার রিস্ক নিতে পারিনি কখনো।

তেমনি জীবনে প্রথম যাকে ভালো লাগবার মতো করে ভালো লেগেছিল তার সাথে কোনোদিন ঠিক মতো কথাও বলতে পারিনি সেই একই কারণে।

“একে তো তুমি পাঞ্জাবী, তায় আবার পাইলট! প্লিজ! বাবা সন্ন্যাসী হয়ে যাবেন”!

“আরে যোধপুর পার্কের কাপুরকে কেউ পাঞ্জাবী বলে না। তুই একেক সময় এতো প্যাথেটিক কথাবার্তা বলিস। কেন যে তোর কাছে আসি সেটাই গুলিয়ে দিস। ইলেভেনে উঠলি কি করে ভগবান জানেন”।

মা সাংঘাতিক পছন্দ করে ফেলেছিলেন এই ঝকঝকে পাইলটমশাইটিকে। আমারই আর বেশি ভাববার সাহসে কুলোয়নি।

হ্যাঁ। আমার যখন তখন বিয়ার-ভদকার নেশাটা মানতে পারেননি। কিন্তু সেখানেও চুল কাটবার মতই আচরণ। মুখে বলেননি কোনোদিন।

“প্রায় ছেড়ে দিয়েছি কিন্তু”- কথাটা ভদ্রলোককে জানাতে পারলে দারুণ হতো।

শনি-রবির সকালগুলোতে এখনো পিছুটান থেকে গেছে বেশ কিছু। দিদি-বোনগুলো উন্মুখ থাকে একটু কথা বলবার জন্য। অনন্ত ফেলে রাখা হোয়াটস অ্যাপের মেসেজগুলোর ঝাড়াই বাছাই করে উত্তর দেবার দিনও শনি-রবি।

আজ কথা হচ্ছিলো ছোটোমাসির সঙ্গে। ফোন রাখবার আগে হঠাৎ বললেন, “অ্যালবাম চেয়ে পাঠিয়েছিস যে, কোনগুলো পাঠাবো বললি না তো”?

“ এটা আবার বলবার কি আছে? পাঠিয়ো তোমার ইচ্ছে মতো” বলতে বলতেই ফোন এসে গেলো আরেকটা।

রেখে দিলাম তাড়াতাড়ি।

জীবনে প্রত্যেকটা সম্পর্কই একটা নির্দিষ্ট মাত্রা নিয়ে আসে। ভালো লাগা, ভালবাসা, নিভে যাওয়া আঁচ বা শুধুই শুকনো কর্তব্যবোধ। আর এই সবকটা সম্পর্কের কাছে কখনোই সমানভাবে সমর্পিত থাকা যায় না বোধহয়।

অন্তত আমি তো পারিনি।

পাওয়া-না পাওয়ার ভীষণ গোলমেলে অংকটায় জড়াতে চাইনি কোনদিনও। চাইও না।

কিন্তু “আমি আমার বাবার মেয়ে” বলে একটা অদ্ভুত শান্ত নিশ্চিন্ত জায়গা আমার আছে যেখানে আমি ফাঁকি দিইনি আজীবন। যেখানে সব কিছু ছেড়ে হাত বাড়াতে আটকায় না আমার কখনো।।

তাই ফিরে দেখা।

আবারও।

দিদাকে হারিয়ে ফেলবার দিনটায়।

 

 

 

 

 

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. besh bhalo hoiche lekhata.sriti satotai sukher.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: