ষষ্ঠ পর্ব

প্লাজার এই রাস্তাটায় পারতপক্ষে পা রাখতে চাই না আজকাল। একে তো পাপী মন তার ওপর কদিন আগে বড়ই হেনস্থা হতে হয়েছে।

এই গত সপ্তাহের কথা। “মাথা সোজা- কিন্তু কিস্যু চোখে ধরা দিচ্ছে না-ভাবে নিমগ্ন” আমার ইউজুয়াল স্টেটে হেঁটে যাচ্ছি, হঠাৎ “হেই! ডার্লিং! পালাচ্ছ কোথায়” শুনে আঁতকে উঠে দেখি ডিয়ন। আমার আদি অকৃত্রিম ফ্রেঞ্চ প্রোফেসর।

দারুণ স্টাইলিশ মহিলা আর ড্রেস সেন্সটা যাকে বলে অসাধারণ।

“কি ব্যাপার বলো তো? কথা নেই বার্তা নেই ক্লাসে আসাটাই বন্ধ করে দিলে”?

“কথা নেই বার্তা নেই আবার কিরকম কথা? আপনাকে বলে এলাম যে এতগুলো জিনিস একসঙ্গে সামলানো যাচ্ছে না”।

“বলেছিলে। কিন্তু স্মৃতি বলে বস্তুটার ওপর ভরসা রাখলে এও বলতে হয়, তুমি ফল সেশনে ফিরে আসবে কথা দিয়েছিলে। সেই শর্তেই তোমাকে যেতে দিয়েছিলাম। তোমাকে টাকা ফেরত দেবার কথা বলাতে তুমি এই আসছি বলে সেই যে ভাগলবা হলে কদাপি আর পদার্পণ করোনি। এখনো না দেখবার ভান করে কেটে পড়তে যাচ্ছিলে…”!

“কক্ষনো না!” ভীষণ প্রতিবাদ করে উঠি এতক্ষণে।

“আমি রাস্তায় চেনা মানুষকেই খেয়াল করতে পারি না বেশিরভাগ সময়। এত ভুল বোঝাবুঝি হতো আগে, এখন সবাই জেনে গেছে অবিশ্যি। এই আপনার মতো কয়েকজন ছাড়া। আর বলেছি তো ফলে ফিরে আসবো। এত তাড়াটা কিসের”?

“তাই নাকি”? ফিরে আসবে”? টোকা মেরে বাতাসে সিগারেটের ছাইটার সঙ্গে আমাকেও উড়িয়ে দেন ডিয়ন।

“আর কবে ফেরত আসবে মা? রেজিস্ট্রশনের জন্য না হোক খান পাঁচেক কাকুতিমিনতি সহ মেল পাঠানো হয়েছে তোমায়। সেগুলো কি স্প্যামে গেছিলো না বাবারে এত এত ফ্রেঞ্চ কে পড়বে এখন বলে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছো তাদের? ক্যালেন্ডারের দিকে একবার তাকালেই বুঝবে ফল আসতে আর ঠিক কতদিন বাকি। ইয়ার্কির একটা সীমা আছে”!

“আরে কাকে এত বকুনি দিচ্ছ ?”, চেনা গলার স্বরে মুখ ফিরিয়ে দেখি মাদাম ফোয়া। একগাল হেসে তক্ষণাৎ জড়িয়ে ধরেন “আহা বকছ কেন! দাঁড়াও না। ও বলেছিল খুব চেষ্টা করবে ফলে ফেরত আসবার, আসবেই এরকম কথা তো আর বলেনি! দেখো দেখি বকুনির চোটে মুখটা ছোট্ট হয়ে গেছে মেয়ের”।

বেঁচে থাক মাদাম ফোয়ার স্নেহশীল আঁখিদ্বয়।

কিন্তু মুখ টুখ মোটেই কিছু ছোট্ট হয়ে যায়নি, আমি আসলে মাথা নিচু করে একাগ্র চিত্তে মিসেস ডিয়নের নেল পলিশের শেড মাপছিলাম। দুর্দান্ত রংটা। সামারের জন্য একেবারে পারফেক্ট। কিন্তু কোথায় পাওয়া যেতে পারে? ফার্মাপ্রি? জঁ কোতু? নাকি সেফোরা? প্রথম দুটোয় ঢুঁ মারা যাবে এখনই কিন্তু সেফোরা হলে আবার ডাউনটাউন যাবার চক্কর, এইসব ভাবতে ভাবতে প্রায় সমাধি হয়ে যায় আর কি হঠাৎ শুনি ডিয়ন বলছেন “ছাত্র পড়িয়েই সারা জীবন গেলো। এরকম ফ্রেঞ্চে অ্যালার্জি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। কতদিন আছিস যেন তুই মন্ট্রিয়লে”?

অসময়ে সমাধি ভঙ্গের বিরক্তি নিয়ে মাথা তুলি, জীবজগতে রিটার্ন করতে সাড়ে তিন ন্যানো সেকেন্ড লেগে যায় আরও “আমি? মন্ট্রিয়লে? কতদিন?” আর উত্তরটা দিতে গিয়েই বাকহারা হয়ে যাই মুহুর্তে।

এই সেদিনের কথা না?

বাবা মা মাসি কাকু কাকিমা বিদায় নিয়েছেন সবে এয়ারপোর্ট থেকে, প্রায় গলা জড়াজড়ি করে বসে আছে মেয়ে দুটো।

রু যে মেয়েটার নাম সে মহা বিমর্ষ। মা বাবার সামনে কান্নাকাটি করবার পাত্রীই নয় সে, কিন্তু ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে এখন। চোখ থেকে সহজে জল পড়বে না , গলার কাছটা খুব ব্যথা করছে শুধু।

“এই ধর এটা। কফিটা খেয়ে নে একটু। বেটার লাগবে দেখ। অনেক দূর যেতে হবে। তুই এরকম মুখ করে বসে থাকলে কি করে চলবে বল। মা না আমাকে তোর ভরসায় ছেড়ে গেলেন? সবাই যে তোকেই কেন এত বিশ্বাস করেন? এই পাঁচু মুখটা ওদের দেখতে হয়না বলেই”।

মিটিমিটি হেসে ফেলে দুজনেই।

কলকাতা-দিল্লী-হিথরো-মন্ট্রিয়ল-কিউবেক সিটি।

হিথরোটা যে এত বড় ধারণা ছিল না কারুরই। তার ওপর সিকিওরিটি চেকিংয়ের অনাচার অবিচার সহ্য না হওয়া রু যখন সমবেত মেয়েপুলিশবৃন্দকে সর্বধর্মসমন্বয় নিয়ে লেকচার দেবেই দেবে ঠিক করে ফেলেছে, সেই মোক্ষম মুহুর্তে তার মুখ চেপে ধরে “ওরে প্লেন ছেড়ে যাবে যে, পরের বার বলিস ওদের ” বলে বন্ধুর মরীয়া ছুটটার বয়সও ছ’বছর হয়ে এলো সেই তত্ত্বটা হঠাৎ এমন করে সামনে আছড়ে পড়ায় ঠিক কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

কোনোরকমে হাত নেড়ে ডিয়ন আর মাদাম ফোয়াকে টাটা করে হাঁটা লাগালাম। নেলপলিশ চুলোয় যাক , কফি চাই একটা আগে।

ছ বছর হয়ে গেলো ক্যানাডাতে? সত্যি সত্যি?

এই অগাস্টেই এসেছিলাম না?

লাসার্তে থাকতাম,কিউবেক সিটির একমাত্র অল গার্লস গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টস রেসিডেন্সি। তিনমাস অন্য জায়গায় ছিলাম কমন রেসিডেন্সে থাকবো না বলে।

“সমস্যাটা কোথায়? মানে ঘর তো সবার আলাদা, তোকে তো আর কোনও ছেলের সঙ্গে একঘরে থাকতে বলা হচ্ছে না, তুই এরকম শিউরে শিউরে উঠছিস কেন বল দেখি”, জিজ্ঞেস করেছিলো আরেক বন্ধু।

অনেক চাপাচাপির পর সত্যিটা বলে দিয়েছিলাম।

“আমার পাশের বাথরুমে কোনও ছেলে বিকট সুরে গান গাইছে আর সেটা শুনতে শুনতে আমাকে শ্যাম্পু করতে হচ্ছে- মারা যাবো ভাই”।

“দেখে যেরকম মনে হয় কেসটা সেরকম নয়। এ মেয়েটা দেখছি বড়ই লাজুক। ভয়াবহ প্রুডও বটে ”, অনেক পরে রায় দিয়েছিলেন এক সিনিয়র।

প্রথম দিন কমন রান্নাঘরে ঢুকেই ওয়াক তুলে সেই যে দৌড় আর জীবনে ঢুকিনি।

খেতাম কি?

বা রে বন্ধু ছিল যে।

সব বানানো হতো আমার ঘরের পুঁচকে মাইক্রোআভেনটায়।

চিকেনে গন্ধ লাগছে, মাটনের নাম শুনলে গা বমি করে- আমার শত বায়নাক্কাতে বন্ধুর রান্নার স্কিল ছাড়া আরেকটা জিনিসও বেড়েছিল- সম্পর্কটার গভীরতা।

আর রান্না-খাওয়া-আড্ডা-পড়াশোনা সব হয়ে গেলে?

“আবার চারতলায় যাবি আজ”?

“থেকেই যাই”?

তারপর যে খাটে সাত বামনের ছোট্টজনও ধরবে না সেইটাতে দুজনে হা হা হি হি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া –রাতের পর রাত।

একদিনের কথা মনে থেকে যাবে আমৃত্যু।

সেটাই প্রথম শীত।

বরফের ওপর হাঁটতে পারতাম না বলে এত পড়েছিলাম যে শরীর জুড়ে শুধু কালশিটে। সকাল থেকেই ল্যাবে সবার বাড়ি ফেরবার তাড়া। ভয়ংকর স্নো স্টর্ম ওয়র্নিং শহরে।

হাতের কাজ শেষ করে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। ল্যাব থেকে হোস্টেল হেঁটে যাতায়াত করতেই সুবিধে কারণ তিনটে মস্ত মস্ত শপিং মল পড়ে রাস্তায়, ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া যায় অনায়াসে।

সেদিনও তাই করেছিলাম।

কিন্তু শেষ বিল্ডিংটা থেকে পা ফেলেই বুঝলাম এ অবস্থা সুস্থ মানুষের কল্পনার বাইরে। কত দূর হবে হোস্টেলটা? মেরেকেটে তিন মিনিট।

ভয় পাইনি। কারণ ভয় পেতে হলে যে সাড়টুকুর দরকার হয়, সেটাও ছিল না তখন।

আজও যখন কারণে- অকারণে ঘুম ভেঙ্গে যায় মাঝরাতে, চোখের পাতায় ফিরে ফিরে আসে ছবিটা।

আমাকে দুহাতে জড়িয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধু, নিশ্চুপ।

মনের দিক থেকে দেখলে মনে হয় মাত্র ছ বছর? সহস্র বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বসে আছি যে।

মৃত্যুর কথা ছেড়েই দিলাম।

কিন্তু কাউকে হৃদয় নিংড়ে ক্ষমা করতে চেয়েও করতে না পারবার যন্ত্রণা মৃত্যুকে মানিয়ে নেওয়ার চাইতে অনেক বেশি কঠিন কখনো কখনো, এটাও তো এই শীতের দেশের নির্জনতাতেই শেখা।

গতকালের কথা।

শনিবার সাতসকালে ওঠবার কোনও যুক্তিই নেই তার ওপরে যখন জানিই দশমিনিট পরেই আবার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে। আসবেই।

কিন্তু তাও ফেসবুকটা একবার দেখা চাই। অভ্যেশ।

লগ আউট করতে যাব, দেখি সনু। মন খারাপ খুব। আমাদের ফ্যামিলির অগাস্ট ব্লু নিয়ে আর বিশেষ কিছু বলবার নেই। বোঝালাম যতোটা পারি, খুব প্রিয় গান পাঠালাম একটা । তারপর উঠে দৌড়ে পালালাম। রুগির চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তারের ঠোঁট কাঁপতে থাকাটা রুগি-ডাক্তার দুজনের মানসিক শান্তির পক্ষেই সমান হানিকর কিনা।

আর ঠিক তখনই শুনি ফোনে রিং হচ্ছে।

“তুমি? এত সকালে”?

“হ্যাঁরে। কাল রাতে কিছুতেই পেলাম না লাইনটা। আর মেলও যে করবো, ইন্টারনেট কাজ করছিলো না ভালো। রাতে ঘুমিয়েছিলি? ঠিক আছিস তো? আমারই চিন্তায় ঘুম হল না, মনে মনে ভাবছি পৌঁছে জানাতে পারলাম না, আরেকজন তো ধরেই নিয়েছে এতক্ষণে মাসি মরে গেছে! আর দেখা হবে না! গুগল করছে ক্যালিফোর্নিয়ায় আজ কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কিনা। কতবার বলেছি না আমি তোকে ছেড়ে যাবো না? ঠিক আছি একেবারে। বুঝলি। কেয়া মাসি তোকে হাই বলছেন। যা একটু ঘুমিয়ে নে এবার। বিয়ে বাড়ি দারুণ জমেছিল। ফিরে সব বলবো। আর ফোনটা কাছে কাছে রাখিস। আমাকে জানিস তো”।

চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে হু হু করে। সনুর থেকে আড়াল করে রাখা জলটা। হয়তো বা নিজের থেকেও।

“কি করে বুঝলে তুমি ঘুমোইনি? কি করে বুঝে যাও তুমি”?

“তাই আমি মিমি”।

এ বন্ধনের জন্মও এখানে। এই শীতের দেশের নির্জনতাতেই।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: