ঊনিশ-বিশ

ভয়াবহ মাথা ঘুরছে কদিন থেকে।

মেট্রো আর নাগরদোলার ভেতরে আদৌ তফাৎ করতে পারছি না। বাসে উঠলেও কেলেঙ্কারি চক্কর লাগছে থেকে থেকেই।

দেখেশুনে বন্ধুরা খুব ভাবিত হয়ে পড়েছে।

সাংঘাতিক চিন্তিত মুখে নীলেশ বলল “কি ব্যাপার বল তো? যতই হার্ট দুবলা হোক, আটচল্লিশ কারো পালস রেট হতে পারে? খাওয়া দাওয়া কি একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছিস বাই চান্স যদি গায়ে একটু গত্তি লেগে যায় সেই ভয়ে”?

আরও গম্ভীর মুখে সূর্যদার সংযোজন “পালস রেটের আর দোষ কি? রক্ত থাকলে তো প্রেসার থাকবে”।

বলাবাহুল্য এতক্ষণ কথা বলবার মতো অবস্থায় ছিলাম না বলেই বাকিরা এত কিছু বলবার সুযোগ পেয়েছে।

ভীষণ বিরক্ত লাগলেও গলা দিয়ে স্বর বেরচ্ছিল না। মোনালিসার দেওয়া নুন-জল খেয়েই আমি আবার স্বমূর্তিতে বিকশিত।

“আমার অ্যাথলেটিক হার্ট মূর্খ!  ব্র্যাডিকার্ডিয়া আছে সেই কবে থেকে। আজ বলে নয় চিরকাল। দেখিস না কষ্ট হলেই নুন জল খাই? সেরে যায় তো”।

আর সূর্যদার ভাবনাটা সত্যিকারের কিন্তু নীলেশ কি ভাবছে সে কি আর আমি জানি না?

“আরে মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে হেব্বি চাপ তো। এরকম নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালাতন করবার আরেকজন কাউকে কি আর আবার যোগাড় করা যাবে”?

সে যাই হোক , ঘটনাটা হচ্ছে বন্ধুমহলে আমার কীর্তিকান্ড একটা খুব জনপ্রিয় বিষয় এবং সেটা আমি বিচ্ছিরি রকম অপছন্দ করি। যেমন এই যে আমাকে নিয়ে আলোচনাটা শুরু হল এটা কিন্তু চলতেই থাকবে।

কারুর ক্লান্তি আসবে না। মাঝেমাঝে  খুব বিবেকদংশন হলে সূর্যদা গলা খাঁকারি দিয়ে বলবার চেষ্টা করবেন “আচ্ছা আচ্ছা অনেক হয়েছে। এবার অন্য কিছু…”

কিন্তু মিটিমিটি হাসিটা পরিষ্কার বুঝিয়ে দেবে “অনেক মোটেই হয়নি। বেশ তো চলছে। চলুক না”।

এই করতে করতেই হঠাৎ নীলেশ বলল “কথা শুনছিস না যেমন দেখবি এরপর তোর মাথাটা ঘুরতে ঘুরতে একদিন কাজ করা বন্ধ করে দেবে। কিস্যু মনে থাকবে না। ওই বুদ্ধিটুকুই তো আছে। সেটাও ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে। হাজার বার বলেছি আবারও বলছি ভাল চাস তো দয়া করে একটু খাওয়া দাওয়া কর”।

এক ধমক দিয়ে ওকে থামিয়ে দিতে গিয়েও নিজেই থমকে গেলাম, “সত্যি বুঝি? এরকম হতেও পারে? তাহলে কি যেটা হয়েছে সেটা এই জন্যেই…?”

“আবার কেস করেছিস? আবারও? বলবি না মানে? বলতেই হবে”।

হয়েছে কি, আমার অনেক রোগের মধ্যে একটা হচ্ছে জীবনেও ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখি না। তার ওপর এই দূর্দান্ত স্বাস্থ্যের জন্য গুচ্ছ টাকা ইনস্যুরেন্স দিতে হয়েছে সদ্য, আজকাল তো তাই আরোই দেখতে ইচ্ছে করে না।

নেহাত সেদিন এক বন্ধুর সঙ্গে একটা ঝামেলা হওয়ায় আমারও মনে হল “স্টেটমেন্টটা একবার বুকে বল এনে দেখেই নি”।

বন্ধু কফি আর কুকি কিনে টাকা দিতে গিয়ে দেখে কার্ড ব্লক হয়ে গেছে। বেইজ্জতির একশেষ, এদিকে পেছনে লাইন লম্বা হচ্ছে হু হু করে।

কাস্টমার কেয়ারে কল করে জানা গেল এই কার্ডটা গতরাতে একটা স্ট্রিপ ক্লাবে ব্যবহার হয়েছে বলে ওরা ব্লক করে দিয়েছে।

বন্ধু দাঁত খিঁচিয়ে উঠলো “বেশ হয়েছে ব্যবহার হয়েছে। আপনার পারমিশন নিয়ে যেতে হবে নাকি? গেছি বেশ করেছি। এখন দয়া করে চালু করো কার্ডটা”।

এই ঘটনার তীব্র অভিঘাতে উপরোক্ত কোনও ক্লাবের ছায়া না মাড়ানো স্বত্তেও স্টেটমেন্টে একবার পলকা চোখ বোলানোটাই মনঃস্থ করে ফেললাম।

কিন্তু এটা কিরকম হল? কিরকম কিরকম যেন লাগছে?

টাকাপয়সা আমার কখনোই বিশেষ থাকে না কিন্তু তা বলে এরকম হাল?

ইনস্যুরেন্স বিলটাকে ইগনোর করে নীচে তাকাতেই ঝাপসা ছবি ঝকঝকে স্পষ্ট হয়ে গেলো।

এবছর ট্যাক্স দেওয়ার সময় বারবার বলেছিলাম ভদ্রলোককে “কেন ঝামেলা করছেন? ঊনিশ টাকা আটত্রিশ সেন্টের জন্য আরেকটা আলাদা চেক বানাবার কথা আমার কিছুতেই মনে থাকবে না। জুড়ে দিন না বাকিগুলোর সাথে, ল্যাটা চুকে যায়”।

“জুড়ে দেওয়া যাবে না মা জননী। এটা আলাদাই বানাতে হবে”।

“ ঊনিশ ডলার আটত্রিশ সেন্ট ঊনিশশো আটত্রিশ হয়ে গেলো তুই খেয়াল করিসনি? মানে বন্ধু স্ট্রিপ ক্লাবে না গেলে তুই জানতেই পারতিস না”?

আর্তনাদ করে ওঠে নীলেশ।

“তারপরেও তুই ঘুমোতে পারলি? ব্যাঙ্কে গিয়ে চেঁচামেচি করিস নি”?

“দরকার পড়েনি তো। আর কাউন্টারে যে ছেলেটা ছিল খুব ভাল দেখতে, চেক বানানোর সাড়ে সাত টাকাও অনেক ক্ষমা টমা চেয়ে ফেরত দিয়ে দিয়েছে”।

“তুই তুলনাহীন”- বলে সোফায় এলিয়ে পড়ে আমার বন্ধু।

বহুকাল পরে আমাকে সত্যি সত্যি চিন্তায় ফেলে দিয়ে।

সিরিয়াসলি কি হচ্ছে আমার? ভুলেটুলে যাচ্ছি নাকি সব? কি হবে এটা যদি বেড়েই চলে?”

মর্মাহত চিত্তে স্যুপ খেতে থাকি।

পরের দিন সকালে চেনা গলা। চেনা ফোন।

“কিরকম আছিস? মাথা ঘোরাটা কমেছে? অ্যালকোহল কিন্তু একেবারে না কটাদিন, লক্ষ্মী মেয়ে”।

“তুমি কোথা থেকে কথা বলছো? কিছু শুনতে পাচ্ছি না কেন?”

“আর বলিস না। ভালো ফোনটা যে কোথায় রাখলাম। এই একটু আগেই কেয়ার সাথে কথা বলছিলাম জানিস। এটা থেকে কিছু শোনা যায় না- ঠিক বলেছিস”।

“বাগানে দেখো। তুমি তো সারাদিন ওখানেই পড়ে থাকো এখন”- বলি আমি।

নাহ। বাগানে পাওয়া যায়নি সে ফোন।

বিছানায়- বাথরুমে কোত্থাও না।

ফ্রিজার থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে কিছুক্ষণ আগে, সেই ফ্রিজ যেটাতে কিছু খুঁজে পেতে হলে মিতা মাসি ছাড়া বাকি পৃথিবীর জিপিএসের স্মরণ নেওয়া অনিবার্য।

মনে কমপ্ল্যান গার্লের স্ফূর্তি ফিরে এসেছে বইকি।

এইটার কাছে ঊনিশশো আটত্রিশ দাঁড়াতেই পারে না।

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. lekhata neesandhaho bhalo o mojar hoiche ,kintu sasthar somondha ja janlam ta chintai fello amai.dekhi okhane giya ki koro jai.kichu to kortai hobe.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: