বুধবারে শুভ যাত্রা বিষ্যুদবারে—- (২)

সেদিন পার্কে দেখছিলাম তিন চারটে ছেলে কি চমৎকার হেঁটে যাচ্ছে দড়ির ওপর দিয়ে।

বারকয়েক বিচ্ছিরি উল্টে পড়লো, ভ্রূক্ষেপ নেই। লোকে সোজাসুজি, আড়চোখে মাপছে, ওরা নির্বিকার। ভাবটা অনেকটা “এই কাজটাই এই মুহুর্তে মনপ্রাণ দিয়ে করতে চাই”।

সপ্তাহের সাতদিনই আজকাল আমার এরকম দশা চলে। সকাল হয়েছে কি না হয়েছে, দড়ি ধরে কেরামতি শুরু, যেদিন ব্যালান্সটা ঠিকঠাক হয়, রাত অব্দি টেনে দি, কোনোদিন মাঝরাস্তায় লুটোপুটি।

বৃহস্পতি সূর্য উঠেছে কি ওঠেনি বুঝে গেলাম আজ আর লুটোপুটি নয়, গড়াগড়ি খাবার দিন।

মন্ট্রিয়ল জায়গা খারাপ না, শুদ্ধু ঠাণ্ডা আর চিকিৎসাসংক্রান্ত যে কোনও ব্যাপার বাদ দিলে। এ দুটো নিয়ে যতো কম বলা যায় ততই মঙ্গল। এখনো যে বেঘোরে প্রাণ দিইনি, ভগবানের অশেষ করুণা।

যাই হোক বুড়ো ডাক্তার আর তার ছুঁড়ি নার্সকে বকে ধমকে অনেক কষ্টে যখন উদ্ধার পাওয়া গেলো তখনো ল্যাপটপের ডাক্তারবাবুর ঘুম ভাঙ্গতে অন্তত ঘন্টাখানেক দেরি আছে। কি করা যায়। বাড়ি ফিরে দ্বিতীয়বার যাবার সময় নেই, এ অবস্থায় সুস্থ মানুষ যেটা করতে পারে সেটাই করলাম।

একটা লার্জ কফি আর বই নিয়ে দোকানের সিঁড়িতে বসে বসে পা দোলাচ্ছি আর ভাবছি “জীবন কি অনিত্য। ল্যাপটপটা কালকেও এই সময় দিব্যি চলছিলো” ।

গভীর ভাবনা চিরকালই ক্ষণস্থায়ী, না হলে অযুতে নিযু্তে সক্রেটিস, প্লেটো প্রতিদিন মর্নিং ওয়কে বেরতেন। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস সক্রেটিসের পক্ষে সক্রেটিস হওয়া অসম্ভব ছিল যদি এই সেল ফোন নামক বস্তুটির ওনার জমানায় অস্তিত্ব থাকতো।

টিং টিং ।টিং টিং।

সারাক্ষণই কারুর না কারুর কিছু না কিছু বলবার আছে। অথচ দু-একজন ছাড়া কাউকেই আমি যে কেন কিছু বলে উঠতে পারি না।

আর জনতারও বলিহারি যাই। আমার মতো বেরসিক মানুষকে কাঁড়ি কাঁড়ি জোকস পাঠানোর কোনও মানে হয়? মাসে একবার গণ ডিলিট করতে গিয়ে দৈবাৎ কয়েকটাতে চোখ চলে গেলে, চোখের জলকে বাঁধ মানানো যে কি কঠিন।

কিন্তু এই মেসেজটা এই মুহুর্তে অস্বাভাবিক অপ্রত্যাশিত বললেও কিছুই বলা হয় না।

এক কালে আমরা দুজন দুজনকে ভীষণ অপছন্দ করতাম। আর অপছন্দ করবার জন্য যে ইক্যুশনটার দরকার হয়, সেটাও অবশিষ্ট নেই এখন।

“একবার দেখা করতে চাই। যে কোনও ক্যাফেতে, তোমার সুবিধা মতো। কিন্তু আজই। মানে আজকেই”।

পর পর পাঁচ চুমুক কফিতেও মাথাটা যেমন ছিল তেমনি ধোঁয়াটেই থেকে গেলো। এ মক্কেল হঠাৎ আমাকে পাকড়াতে চাইছে কেন?

মুখ চোখ লাল করে বলেছিল না “তোমার মতো অপমান আমাকে কেউ কখনো করেনি। কি ভাবো তুমি নিজেকে”?

“সত্যি কথা বললে কেউ অপমানিত বোধ করলে সত্যিটা তো আর বদলে যায় না। রণে বনে  অন্তরীক্ষে যেখানেই দেখা হোক, ফরাসি ভদ্রতার দোহাই দিয়ে এই যখন তখন গালে থুথু মাখিয়ে চুমু খাওয়ার তোমার এই সদা অদম্য প্রচেষ্টা যে আমি কিছুতেই বরদাস্ত করবো না এরকম ইঙ্গিত কি তোমাকে আগে বহুবার দেওয়া হয়নি? ইঙ্গিতে কাজ হয়নি তাই স্পষ্ট কথায় বলছি”।

সেই শেষ।

হাই হ্যালো বলাটাও বন্ধ হয়ে গেছিলো পরের দিন থেকে।

প্রায় তিন বছর পর আজ এই মেসেজ।

কি যে হল নিজেও ভাল করে বুঝে ওঠাবার আগেই দেখলাম রিপ্লাই চলে গেছে , “খুব দূরে কোথায়ও পারব না। সন্ধ্যে আটটা নাগাদ বাড়ি থেকে উঁকি মারলে দেখা যায় সেকেন্ড কাপে আসলেও আসতে পারি”।

তারপর যথারীতি এটা নিয়ে আর সময় নষ্ট করবার মতো সময় ছিল না, স্মরণে এল আবার বাড়ি ফেরবার পথে।

সেকেন্ড কাপে ঢুকলেই মনে হয় রিটায়ার করবার চাইতে বেশি আনন্দ আর কিছুতেই নেই। এক দল বুড়োবুড়ি দিবানিশি মহানন্দে হা হা আড্ডায় মত্ত।

বাজেও প্রায় সোয়া আটটা।

একটা করে বুড়োবুড়ির দলকে কাটাই আর চিরুনিতল্লাশি চালাই, ছেলেটা আছে না নেই।

না থাকলে, দেওয়াল থেকে মিটিমিটি চেয়ে থাকা এই পুতুলওয়ালা ঘড়িটার একটা ছবি তুলে এক্ষুনি কেটে পড়বো। এসেছিলামই যে শুধু নয়, কাঁটায় কাঁটায় আটটা সতেরো অব্দি ছিলাম পরিষ্কার বোঝা যাবে।

কিন্তু একেবারে শেষের টেবলে ওটা কে? আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াচ্ছে?

অনেকদিন এত ঘাবড়ে যাইনি।

“এ কি চেহারা হয়েছে? রাশি রাশি কমন বন্ধুদের থেকে শুনেছিলাম বটে কিসব ভিসা টিসা নিয়ে ঝামেলা চলছিলো ওর। কিন্তু তার দরুণ এরকম হাল হতেই পারে না কারুর”।

এত থতমত খেয়ে গেছিলাম যে কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

“আমিও কিছু নিইনি এখনো। বসো তুমি। আমি কফি আনছি। ব্ল্যাক তো”?- বলতে বলতেই হনহন হাঁটা লাগিয়েছে, আমার সঙ্গে ভাল করে চোখাচোখি হওয়ার আগেই।

কফি আসে।

খুচরো বার করে সামনে রেখে দি।

“একটা কফিও খাওয়াতে দেবে না”?

“আমার কিন্তু এবার ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। মুখোমুখি বসে নৈঃশব্দ উপভোগ করতে করতে কফি খাওয়ার সম্পর্ক আমাদের নয় সেটা কিন্তু দুনিয়া জানে। আমার আবার নাটক বেশীক্ষণ সহ্য হয় না”- পাক্কা সাড়ে বারো মিনিট ভদ্রতা করবার পর বলে ফেলি আমি।

“- র সাথে আমার সম্পর্কটা আর নেই তুমি জানো”?-অবশেষে স্বর ফোটে তার।

বাক্যটা কফির গন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে যাবার আগেই ভয়াবহ রাগ হয়ে যায়।

এই ব্যাপার? এর জন্য সারাদিন পরে হা ক্লান্ত অবস্থায় নিজেকে টেনে এনেছি এখানে? এই অর্বাচীনের ভাঙ্গা মন জোড়া দেবার জন্য? ভেবেছেটা কি এ হ্যাঁ?

অজস্র কাউন্সেলিং করেছি একটা সময়- তখন বয়স ছিল, ধৈর্য্য ছিল। আর মানুষের প্রতি বিশ্বাস জিনিসটা আজকের চাইতে সামান্য হলেও বেশি ছিল।

আজকাল আর একেবারে পোষায় না।

কিন্তু পরের দশমিনিটে আমূল বদলে গেলো দৃশ্যটা।

খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল ও, আমার চোখে চোখ রেখে। আর আমি ক্রমশঃ বুঝতে পারছিলাম যুগ যুগান্তর পরে দুটো মানুষের চাওয়া পাওয়া নিয়ে এত সত্যি কথা শুনছি আমি।

আরও খানিকক্ষণ বাদে, নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে কল করলাম মেয়েটাকে, সেই আসলে আমার বন্ধু। তার সূত্রেই আলাপ সামনে এখন যে বসে আছে তার সঙ্গে।

সাংঘাতিক বড়োলোকের কন্যে। অসম্ভব নরম ধরনের। কিছু বললেই ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলে। সে যে হঠাৎ কেন এই রসকষহীন সারাদিন ল্যাবে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা ছেলের সাথে জড়িয়ে পড়ল এটা বন্ধুমহলে প্রশ্ন ছিল বহুদিন। কিন্তু ওই যে, যার সাথে যার মজে মন- দিদা বলতেন।

তলব পেয়েই হু হু দৌড়ে আসে মেয়ে।

আর আমাদের দেখেই নিমেষে শক্ত হয়ে যায় “তোর কি বলবার আছে বল। আর কারুর মুখদর্শন করতে চাই না আমি”।

মা বলতেন –হৃদয় দিয়ে কোনও কিছু বিশ্বাস করলে সেটা খুব গোলমেলে অবস্থাতেও ঠিকঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া যায়।

তাই ঘন্টাদেড়েক পরে যখন দেখলাম একটা ছোটো হাতকে অনেকটা বড় একটা মুঠো আপন করে নিচ্ছে, অবিশ্বাস্য কঠিন শব্দজব্দের উত্তর খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দ হচ্ছিলো।

হয়তো কালই ওরা আবার মারামারি শুরু করবে।

কিংবা হয়তো আরও কিছুদিন দড়িটার ওপর দিয়ে একসঙ্গে হাঁটবার চেষ্টা করবে।

যাই করুক না কেন- ওদের জন্যই গড়াগড়ি খাওয়া তো দূরের কথা, দড়ির শেষটা ছুঁয়ে ফেলতে পেরেছি আজ।

ল্যাপটপটা ফেরত না পাওয়াতে, হাতের ব্যথাটা বিন্দুমাত্র না কমাতেও কিস্যু যায় আসছে না তাই।

বেঁচে থাক ভালোবাসা।

Advertisements

3 Comments

Add yours →

  1. besh bhalo hoichey.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: