বুধবারে শুভ যাত্রা বিষ্যুদবারে—- (১)

“অনেকদিন ধরে তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করবো করবো  ভাবছি। আচ্ছা ব্লগটার নাম পেনসিল কেন”?

“মানে”?

“মানে এই নামটা কি তুমি ভেবেচিন্তে রেখেছ নাকি জাস্ট মাথায় এসেছিলো বলে রেখে দিয়েছ”?

মেয়েটা একেবারে বাচ্চা, বছর দেড়েক হল কলেজে যাচ্ছে  কিন্তু আলাপ হওয়ার পর মুহুর্ত থেকেই দেখে আসছি জানার তৃষ্ণা ওর অসীম। বইটই পড়ে, আমার বিচ্ছিরি ড্রাই সেন্স অফ হিউমারটাও মেনে নিয়েছে তাই টুকটাক প্রশ্নোত্তরের পালা চলতেই থাকে। আর আমার সেটা খারাপ লাগেনা একটুও।

কিন্তু আজ হাতে মোটে সময় নেই। বহুযুগ পরে বুধবার ছুটি, লাস্ট রোববারের আড্ডায় আর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া সমস্ত কাজগুলো কমপেনসেট করতে হবে।

“পরে বলি? অনেক কাজ রে এখন”।

“কেটে পড়বে বলছ? ওকে ওকে। কিন্তু এই উত্তরটা অ্যাট লিস্ট দিয়ে যাও”।

“কি বল দেখি। পেনসিলের নাম পেনসিল না হয়ে খাগের কলম কি নেই তাই খাচ্ছি হলেও কিচ্ছু  যেতো আসতো না। কিন্তু পেনসিলের নাম পেনসিল হওয়ার কারণটা খুবই সিম্পল। পেনসিলে লেখা তো মুছে দেওয়ার জন্যই। আজ আছে কাল থাকবে না”।

“বুঝলাম। তোমার প্ল্যানটা হচ্ছে আজ ধৈর্যে কুলোচ্ছে তাই পেনসিল নিঃশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু কালও যে নেবেই এরকম কিছু দিব্যি করে বলবার বিন্দুমাত্র বাসনা তোমার নেই। ব্রিলিয়ান্ট। তা এই তিন চার মাস ধরেই বা লিখছো কেন? বন্ধ করে দাও”।

চমৎকৃত হয়ে যাই। সত্যি ছোটোদের থেকে যে কত কিছু শেখবার আছে।  ডালপালা বাদ দিয়ে কোনও কিছুর সারমর্ম উদ্ধার করতে ওদের ধারেকাছে বড়রা (আই মিন বুড়োরা) আসেন না।

“ঠিক আছে? বাকি প্রশ্নগুলো নেক্সট সেশনের জন্য থাক”?

“যাবে? আচ্ছা যাও তাহলে। কিন্তু একটা কথা বলো। একটাই জাস্ট। তুমি গতবার কলকাতায়  আমার সঙ্গে দেখা করলে না কেন? লাস্ট মোমেন্টে ক্যানসেল করে দিলে? আমি তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না এটা  কি জানো”?

এতক্ষণে আমার একটু একটু রাগ হতে থাকে। শুধুমাত্র এই বিষয়টা নিয়ে এর আগে আমাদের মধ্যে সাড়ে তিনশ লাইন আদানপ্রদান হয়েছে বলে নয়, একটু পরেই ও আমাকে নিরানব্বইবারের মতো “কথা দিয়ে কথা রাখোনি” বলবে বলেও নয়। আমার বিরাগের উৎস এই আলোচনাটা কোনোবারেই কোথাও পৌঁছয় না। সহস্রবার এক্সপ্লেন করা স্বত্বেও এটা কেন যে ওর মগজ নিতে পারে না এ আমার অজানা।

“অ্যাকিউট কেস অফ অ্যালঝাইমা্রের রোগীকেও এতবার মনে করিয়ে দিতে হয় না যতবার তোকে বলেছি, সেদিন উকিলের সাথে মিটিং শেষ হতে রাত্তির দশটা বেজেছিলো মনে পড়ছে? তারপর দেখা করতাম? বুঝতে পারছিস কি যে তুই বাজে বকতে শুরু করছিস আবার”?

“হতে পারে। করতেই পারি। কিন্তু তুমিও কি বুঝতে পারছ যে তোমার উকিলের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যই তোমার সাথে সারাজীবনে আমার আর দেখা নাও হতে পারে? এই ভাবনাটা থেকে থেকেই খুব ট্রাবল করে আমাকে”।

রাশিকৃত জামাকাপড় আর সাবান ভেজা হাত নিয়ে লগ আউট করতে গিয়েও বসে পড়ি আবার।

“সারা জীবন? স্কেলটার ব্যাপ্তি সম্বন্ধে বিশেষ আইডিয়া আছে তোর?”

“নেই। আবার আছেও। তুমি তো বলেই দিয়েছ ইন্ডিয়া আসবে না কক্ষনো আর আমিও প্রাণ থাকতে ক্যানাডায় যাবো না। স্কেলটা মেজার করতে পারছ এবার?”

“এরকম কিছু বলেছিলাম- না”?

বজ্রাহত রিপ্লাই এলঃ “তুমি জিজ্ঞেস করছ বলেছ কিনা? সিরিয়াসলি? যতদিন কলকাতায় ছিলে জন্মেও তো নিজে  থেকে একটা ফোন করোনি। যতবার কথা বলেছি বাই বলবার আগে একটাই কথা- আই অ্যাম  ডান উইদ দ্যিস সিটি,আই অ্যাম  ডান উইদ দ্যিস কান্ট্রি। আই ডিটেস্ট দেম অল। নেভার আগেইন। কম বুঝিয়েছি তোমায়? মাস দেড়েক আগেই তো মারামারি হয়ে গেলো এই নিয়ে। ভুলে গেছ? তিন দিন কথা বলোনি। এত স্টাবার্ন যে কর্ণপাতই করো না। অ্যালঝাইমার যে কার হয়েছে ভগবান জানেন”।

লক্ষ্যই করিনি কখন সাবানের ফেনা আঙুল থেকে টুপটুপ ঝরতে শুরু করেছে কার্পেটে।

“ঠিক আছে। চল। ২০১৬। দেখা হবে। প্রমিস”।

তারপরেই দৌড় লাগাই নিচে। উল্টোদিকের কিংকর্তব্যবিমূঢ় রিয়্যাকশনের অপেক্ষা না করেই।

বেসমেন্টে ঢুকতেই ভয়ানক খুশি খুশি হয়ে যায় মনটা। রোদ ঝকঝক আকাশ। সারা অ্যাপার্টমেন্ট খালি, জনগণ বেরিয়ে পড়েছেন ক্যানাডা ডে পালন করতে, লণ্ড্রীরুমটা আমায় ছেড়ে দিয়ে।

শীতকাল চলে গেছে, ফাইন্যালি- এই অনুভূতিটা যেরকম অবর্ণনীয় তেমনই এই মণ মণ  সোয়েটার-জ্যাকেট কেচেকুচে গুছিয়ে তোলার যন্ত্রণাটাও ভাষায় প্রকাশ করা আমার সাধ্যাতীত।

সেই মূষল পর্ব যখন প্রায় শেষের দিকে, রিয়্যালাইজ করলাম সকাল থেকে কফি ছাড়া আর কিছু বানানোর ইচ্ছে হয়নি।

তাড়াতাড়ি ফ্রিজ থেকে জ্যুসের প্যাকেট নিয়ে আসি একটা। গায়ে জোর চাই না?

কারণ আমার চাইতে ভাল আর কেইবা জানে যে এর পরের অধ্যায়টা কি পরিমাণে সংকটজনক হতে চলেছে।

সোফায় পা ঝুলিয়ে ঝলকে তাদের সংখ্যা এবং রকম দেখে নিজের ওপর ভয়াবহ বিতৃষ্ণা এসে যায়। কোন আক্কেলে এত জুতো মানুষ কিনতে পারে?  একদিনে কেনা নয় ঠিকই, বছরের পর বছর ধরে এই অমূল্য সংগ্রহ তৈরি হয়েছে কিন্তু তাই বলে এত? নাহ। আজই বাতিল করবো যতোগুলো সম্ভব। না হলে  সেদিন আর খুব দূরে নেই যেদিন এ বাড়িতে শুধু বই আর জুতো বাস করবে।

কোনগুলো রাখবো আর কোনগুলো ফেলবো ঝাড়াইবাছাই করতে গিয়ে আরেক জ্বালা। মা  আর  দিদার অন্ততপক্ষে আট জোড়া চটি দেখি সগৌরবে বিদ্যমান। দুই ভদ্রমহিলারই স্টাইলে কমতি  ছিল না কিছু- “এই শোন না, এটা না আমি পরতে পারব না রে কিছুতেই। কেনবার সময় বুঝিনি কিন্তু এখন দেখছি হিলটা এত কম। তুই তো ফ্ল্যাট সোল খুব ভাল ম্যানেজ করতে পারিস। লক্ষ্মী মেয়ে, স্যুটকেসে দিয়ে দিলাম হ্যাঁ? এখানে থাকলেই নষ্ট হবে”।

প্রত্যেক জোড়ার সঙ্গে একটা করে গল্প লুকিয়ে আছে। কি করে এরা পৌঁছল এসে আমার কাছে। মা আর মেয়ে ওপর থেকে মজা দেখছেন নিশ্চয়ই কিন্তু আমি এখন এই স্মৃতির শ্যুমহল নিয়ে কি করি। কিছুতেই পায়ে গলাতে পারি না  যে ওদের।

নাহ। আর সঞ্চয়ে কাজ নেই। মনে জোর এনে পরেই ফেলব এবার।

আরও ঘন্টাখানেক কেটে গেছে তারপরে।

নিজের কর্মকুশলতায় মুগ্ধ আমি সবে নিজের পিঠ চাপড়ে বলেছি “ গ্রেট জব! ইউ হ্যাভ আর্ন্ড ইয়োরসেলফ আ বিয়ার নাও”।  বললাম বটে কিন্তু চিত্তে শান্তি নেই।  প্রথম চুমুকটা দিতে দিতেই মনে হল ‘এহ। সব কিছুই যখন সাফাই হচ্ছে এ বেচারিই বা বাকি থাকে কেন?”

যেমন ভাবা তেমন কাজ। আর তেমনি তার ইক্যুয়াল অ্যানড বিলকুল উল্টো আফটার ইফেক্ট।

ফলশ্রুতি ঠিক আড়াই মিনিটের মধ্যে খারাপ হয়ে গেলো ল্যাপটপটা।

আমার আবার একটা রোগ আছে। নিতান্ত মরোমরো অবস্থা না হলে আমি কদাপি ডাক্তারের মুখ দেখায় বিশ্বাসী নই। সিমিলার লজিকে তাই যে কোনও জিনিস খারাপ হয়ে গেলে সেটাকে তক্ষুনি তক্ষুনি সারাই করবার জন্যে হইহল্লা জুড়ে দেওয়াটাও আমার সাংঘাতিক অপছন্দ।

সর্বাগ্রে নিজে চেষ্টা করি কেসটা কি দাঁড়িয়েছে সেইটা বোঝবার। এবং বেশির ভাগ সময়েই গুগল আর পুঁচকে যন্ত্রপাতির বাক্সটাই সমস্যার সমাধান করে দেয়।

কিন্তু এবার গুগলই কনফার্ম করলো কি বোর্ডটা পরলোকগমন করেছে খুব সম্ভবত।

ইতিমধ্যে বাঁ হাতটাও ব্যথা করতে শুরু করেছে বেশ, সারাদিনের অত্যাচারে। ভালই হল একদিক দিয়ে। কাল সকালে আমিও ক্লিনিকে যাব, ল্যাপটপটাও।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: