এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়

“তুই বাড়িতে এত ইংরেজি বলিস কেন রে? কাকিমাও রাগ করতেন এই জন্যে মনে আছে? একে তো দেশ থেকে যোজন দূরত্ব তার ওপর সারাদিন কাজের সময় অনর্গল বলেও ক্লান্তি আসে না? ইচ্ছেও করে না একটু বাংলায় কথা বলতে”?

পাড়াতুতো দিদির অভিযোগের পালা চলতেই থাকে আর আরো আরো হতভম্ব হয়ে যাই আমি। “বলিস কি রে! আমি খামখা ইংরেজিতে কথা বলতে যাবো কেন বাড়িতে?  আমি উন্মাদও নই, বাংলা মায়ের অ্যাংলো সন্তান তো ছিলামই না কোনোদিন। তুই আমাকেই বলছিস কি এই কথাগুলো?”

একটুও না দমে এক নিঃশ্বাসে দিদি বলল “হ্যাঁ  তোমাকেই বলছি। তুই শুরু করিস বাংলায় সেটা ঠিকই কিন্তু তারপর টুক করে যেই একবার ইংরেজিতে চলে যাস আর মাতৃভাষায় ফেরবার নামও করিস না। নিজের অজান্তেই করিস বুঝতে পারি কিন্তু খুব বাজে অভ্যেস। সময় থাকতে বদলে ফেল”।

ফোনটা হাতে নিয়ে বসেই থাকি। শোকে পাথর হয়ে। বসে থাকতে থাকতেই হঠাৎ  খেয়াল হয় ঠিক এরকম কিছু একটাই কদিন আগে ছোটোমাসি বলছিলেন না?

“বাংলা বল না বুড়ি। আমার সঙ্গেই তো কথা বলছিস”!

সাংঘাতিক লজ্জা পেয়েছিলাম না সেদিন?

নাহ। এটা থেকে যেভাবেই হোক বেরোতে হবে। রুমমেটকে বললাম ইংরেজি বললেই ঝুপ করে মাঝ রাস্তায় থামিয়ে দিতে। কিন্তু সে নিজেই তো——- যাক সে কথা।

নিজেকে কষে ধমক লাগালাম বেশ কয়েকটা। সচেতন থাকতে হবে খুব। কিছুতেই যেন দরকার ছাড়া ইংরেজি না বেরোয়।

ভালই চলছিল। মানে আমার ধারণা ভালই চলছিল। দু-একবার ছোটো ছোটো ঠোক্কর খেলেও সামলে নিচ্ছিলাম ঠিক।

কিন্তু আমার যেমন কপাল। গল্প একটা তৈরি হয়ে যাবেই যাবে।

গত রবিবারের কথা।

সকাল থেকেই মেজাজটা খিটিমিটি হয়ে ছিল। শনিবার রাতে জন্মদিনের পার্টি সেরে বেরিয়ে যে বন্ধুর সাথে রাত্তির দেড়টা অব্দি আড্ডা মেরেছি সে যদি রোববার সকাল এগারোটায় ফোন করে বলে “চল না লাঞ্চে দেখা করি। কতদিন আড্ডা হয় না বল”- তাকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক?

আড্ডাটা দেড়টাতেই শেষ হয়েছিল নেহাত লাস্ট বাস চলে যাবে বলে।  দূর দূর করে তাড়িয়েছিলাম সকালে অজস্র কাজের দোহাই দিয়ে।

রান্নাঘর সাফাই আর লন্ড্রি এই দুটোই সবচাইতে মোক্ষম এবং সময়সাপেক্ষ।

সকাল থেকে সোফায় গুটিসুটি মেরে পাঁজিটার খোঁজ করছি যে কোন শুভক্ষণে এই কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়লে পৃথিবীর মঙ্গল ঠিক সেই মুহুর্তে অপয়াটার ফোন।

“আয় না বাবা। কিরকম চমৎকার বাইরেটা বল? এরকম সময়ে ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে তোর? বার্গার খেতে হবে না তোকে, সমস্ত রকমের অখাদ্য স্যালাড পাওয়া যায় প্লাজাতে। প্রমিস”।

অতঃপর গিল্টে সেদ্ধ হতে হতে অঝোর বৃষ্টি মাখা।

খেয়েদেয়ে যেই বলেছি “এবার বাড়ি যাবো। যাবই যাবো”, মুচকি হেসে একজন বলল “যাবিই যাবি?  ফ্যাক্টরি আউটলেটগুলোয় একবার ঢুঁ মারলে হতো না? সামার কালেকশন এখন না করলে আর কবে—–?”

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট-বাবা মনে করাতেন।

চোরা না শোনে ধর্মের বাণী-মা বলতেন।

কোনোটাই মগজে না রেখে চিরকালের অবাধ্য মেয়ের ভিজে চুপ্পুর দৌড় শহরের বাইরে। কি না কুট্টি  কুট্টি  জামা কেনা হবে! ছিঃ।

যথারীতি কিস্যু পছন্দ হল না।

“তোদের জন্য সারাদিনটা জলে গেলো আজ” বলতে বলতে আবার ছুট বাসস্টপের সন্ধানে। ছুটতে ছুটতে শুনতে পাচ্ছি পেছন থেকে ভেসে আসা হাড় জ্বালানো মন্তব্যসকল- “ এমনিতে এত দুবলা পাতলা হলে কি হবে, দ্যাখ আমাদের ছাতাগুলো কিরকম উল্টেপাল্টে একশা এই হাওয়ায়, ওর ছাতাটা কি স্ট্রং”!

ছাতা হাওয়ায় উল্টোবে কি উল্টোবে না সেটা যে বস্তুটা ধরবার কায়দার ওপর নির্ভর করে এই অর্বাচীনদের কে বোঝাবে?

এই বয়সে আর অপাত্রে জ্ঞ্যান দান পোষায় না।  আর এস্পেশ্যালি এই পাবলিকদের হাতে যেখানে যখন তখন ভীষণ অপমানিত হতে হয় আমাকে।

ধরুন বন্ধুদের মধ্যে কেউ বাড়ি বদলাবে।

“ইন্দ্রাণী দেরি করবি না কিন্তু”।

ওমা পৌঁছে গেছি ঠিক সময়ে। যেই ভারি ভারি স্যুটকেসগুলো একটু নাড়াচাড়া করে দেখতে যাবো, হইহই রব উঠবে একটা।

“আরে করিস কি। করিস কি। ওগুলো খুব হালকা। তোকে অনেক ওজন বইতে হবে তো। বলে হাতে তিন চারটে টেডি ধরিয়ে দেবে”।

তারপর বলবে “হ্যাঁরে কষ্ট হচ্ছে না তো? কষ্ট হলে বলিস। ওরাই তোকে কোলে করে ওপরে উঠে আসবে”।

এতো কিছুর পরেও আমি যে কেন এদের বন্ধু বলি।

যাই হোক। রাস্তা পার হতে না হতেই বাস চলে এসেছে। মেঝেময় থই থই জল।  তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে আমাদের অবিরাম হা হা হি হি তে ড্রাইভার সাহেবের ঠোঁটের কোণেও একটা মিচকি হাসি দেখা দেবে দেবে করছে, এইসময়ে হঠাৎ দেখি সিটের নিচ থেকে হু হু করে গড়িয়ে আসছে কিছু একটা। নিশ্চয়ই সামনের বইয়ে ডুবে থাকা শান্তশিষ্ট দেখতে  ভদ্রলোকের সম্পত্তি।

কিন্তু কি যেন বলে এই সবুজ গোলকটিকে?

দিশাহারার মতো চেষ্টা করতে করতে মনে হল , এটাই নামটা। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতেও এই নামটাই দেখেছি।

আর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে কানে এল বিশুদ্ধ বাংলায় আমার প্রাণপণ হাহাকার “আরে আরে তরমুজটা যে গড়াগড়ি খাচ্ছে! ওইটা আপনারই তো?”

যে ভয়াবহ মানসিক অবস্থায় তরমুজের ইংরেজি তরমুজ মনে হয়, সিমিলার স্টেটে গড়াগড়ির ইংরেজি যে গড়াগড়ি হবে খুব স্বাভাবিক।

মিনিট পাঁচেক পর পরিস্থিতি যখন খানিকটা আয়ত্বে, তরমুজ সশরীরে প্যাকেটজাত হয়ে হতচকিত ভদ্রলোকের বুকে মাথা রেখেছে, তাঁর ফ্যালফেলে মুখে ধীরেধীরে  সার ফিরে আসছে,  আমার স্যরি বলতে বলতে কান লাল হয়ে গেছে , তখন আড়চোখে তাকিয়ে দেখি বাকিরা পেট চেপে বসে পড়েছে।

সেই অসহ্য হাসির দমক যে আগামী ছমাসেও কমবে না সে আমি ভালই জানি।  এটাও জানি আমি হাজার চেপে যাবার চেষ্টা করলেও এ কাহিনী মিমির কাছে পৌঁছবেই।

খিলখিল হাসিটা শুনতে পাচ্ছি এখন থেকেই “ তোর যতো বাড়াবাড়ি! ভাষা ভাষাই। যেটা সহজে আসে সেটাই বলবি! লেটস নট ট্রাই দ্যাট হার্ড!”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: