একলা চিঠি

এক মুখের আদল ছাড়া মায়ের সঙ্গে আমার বিশেষ মিল নেই।

ইকনমিক্সের ছাত্রী মা ছিলেন অস্বাভাবিক খরুচে, আমার ইনভেস্টমেন্ট পলিসি খুব স্পেসিফিক আর ইকনমিক্স শব্দটা বানান করতে পারি এই অব্দি।

ইউনিভার্সিটি হার্ট থ্রব মা পরীক্ষার ঠিক সাতদিন আগে প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া প্রোফেসরের চোখে চোখ রেখে সটান বলতে পেরেছিলেন “খাতায় আপনার যা ইচ্ছে করতে পারেন কিন্তু আপনি যা চাইছেন সেটা কখনোই হবে না”।  মায়ের মেয়ে এই অবস্থায় পড়লে সম্ভবত স্ট্রিম, কলেজ সব কিছু বদলে ফেলত কিন্তু এত স্পষ্ট কথা বলে উঠতে পারতো বলে মনে হয় না।

যাঁরা আমাকে স্মার্ট বলেন তাঁরা মাকে দেখেননি।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আবার একবার বুঝতে পারছি, মা আর আমি কিন্তু সে অর্থে বন্ধু ছিলাম না কোনোদিন। ব্যক্তিত্বটাই এমন ছিল ভদ্রমহিলার যে ওরকম কিছু ঠিক ভাবাও যেতো না।

আমি তখন  ষোল।

একদিন কাছে ডেকে বললেন “শোনো, তুমি অপূর্ব কিছু সুন্দরী নও সেটা নিশ্চয়ই জানো কিন্তু তাও তোমাকে যেরকম দেখতে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ছেলেদের অ্যাটেনশন তুমি ভালই পাবে। এখন বড়ো হচ্ছ, মা-বাবা তো সারাক্ষণ তোমার ওপর নজরদারি করবেন না, নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে শেখ”।

ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করলাম কিরকম সেই দায়িত্ব নেওয়া?

“এখন তোমার ক্লাস ইলেভেন। তোমার প্রেমে যারা পড়বে তারা ম্যাক্সিমাম টুয়েলভ কি ফার্ষ্ট ইয়ার। তাদের জ্ঞ্যানকাণ্ড তোমারই মতো কি তোমার চাইতেও খারাপ। সিরিয়াস যদি হয়ে যাও কোনও সম্পর্কে পড়াশুনোর মারাত্মক ক্ষতি তো হবেই, জীবনটাও খুব গোলমেলে হয়ে যেতে পারে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যা ইচ্ছে করতে পারো, না করবো না। কিন্তু এই বয়সে সমস্যা তৈরি করলে তার দায় সম্পূর্ণ তোমার। তখন আমাদের কাছে এসে ঘ্যানঘ্যান করবে না। তুমি আমাকে জানো। তাই এটাও জানো যে সে সুযোগ তুমি পাবে না”।

ঘাড় নিচু করে শুনলাম। বুঝলাম যা বোঝবার।

ওই টনিকের পর আর কেউ প্রেম করবার কথা ভাবতে পারে? মানে আমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি যে ঝালমুড়ি খেতে খেতে মাকে সফল-ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী শোনাচ্ছি আর মা সহানুভুতি ভরে শুনে মাথায় হাত বোলাচ্ছেন।

নাহ। প্রেমের চক্করে আমি পড়িনি কিন্তু আড্ডাবাজ ছিলাম ভয়ংকর। অজস্র ছেলে বন্ধু আর অবিরাম আড্ডা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার এই যে সেটা নিয়ে মায়ের কক্ষনো আপত্তি দেখিনি। অষ্টমীর রাতে ঠাকুর দেখতে বেরবো, দুই পাবলিক এসে বকেই যাচ্ছে। যতো বলি “ওরে এবার তোরা গাত্রোৎপাটন কর, আজকের মতো ক্ষ্যামা দে, মা ততই বলেন “দাঁড়া যাবে যাবে। বছরকার  দিন এসেছে। তাড়া মারছিস কেন?” অথচ ওরা কোনও না কোনও ছুতোয় সপ্তাহে অন্তত তিনদিন বাড়িতে হাজিরা দেয়।

আমি কখনো বই ছাড়া খেতে বসতে পারি না। কিছুতেই ছাড়াতে পারেননি এই অভ্যেশটা।

রাগ করতেন খুব। “একটু কথা তো বলতে পারিস। সারাদিন কি হল। মুখটাও তো বইয়ে ঢাকা থাকে”।

“হুঁ হুঁ বলে আবার বইয়ের পাতায় ডুবে যেতাম আমি”।

এই পাগলের মতো বই পড়া নিয়েও সদা ঝামেলা!

“সারাদিন কি পড়ে তোমার মেয়ে? একটু দেখতে পারো তো? ক্লাসিক কিছু পড়বার নাম নেই, যতো সব ট্র্যাশ!”

“বাবা! মা সিডনি শেলডনকে ট্র্যাশ বলছেন তুমি মেনে নেবে!”

তরজা চলতেই থাকতো।

এগুলো তো কিছুই নয়। কিছু ক্ষেত্রে ফান্ডামেন্টাল ডিফারেন্স ছিল আমাদের।

দুজনেরই সমান তেজ। দুজনেই সমান জেদী।

নাহ। সমান ছিলাম না কোনোদিনই।

মায়ের বিশ্বাস ছিল গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করাটা শিক্ষার একটা অঙ্গ। আর এই মায়ের মেয়ে হওয়ার জন্যই সম্ভবত, আমি অত্যন্ত ওপিনিয়নেটেড এক প্রাণী খুব ছোট থেকেই।

“যখন তখন যেখানে সেখানে যার তার সামনে মাথা ঝোঁকাতে পারব না মা। কাউকে দেখে যদি সত্যি মনে হয় নিশ্চয়ই করবো প্রণাম। বাট নেভার ফর দ্য সেক অফ ইট”।

অশান্তি হয়েছে বিস্তর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মা কে মেনে নিতে হয়েছিল এটা।

বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন চাকদা স্টেশনে হাজার লোকের ভিড়ে মায়ের সদ্য পরিচিত এক সহকর্মীর পা ছুঁয়েছিলাম বলে।

“আমি তো কিছু বলিনি তোকে! তোর সত্যি মন থেকে উমাদিকে প্রণাম করতে ইচ্ছে হল বলে করলি? এই ভিড়ের মধ্যে”?

সেদিনের পর থেকেই মেনে নিয়েছিলেন।

একটা বয়সের পর সব মেয়ের মায়েরাই তাদের বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামান।

আমার মায়ের কোনও ভ্রূক্ষেপ ছিল না এটা নিয়ে।

“যথেষ্ট যত্ন নিয়ে মানুষ করেছি তোমাকে। পড়াশুনোও শেখানো হয়েছে। তোমার বুদ্ধি শুদ্ধিও নেহাত খারাপ নয়। এরপরও যদি তোমার বিয়ে নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হয় তাহলে বুঝতে হবে দেশের অবস্থা বিপজ্জনক রকম লজ্জাকর। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাও। বিয়ে ক্যান হ্যাপেন এনি টাইম”।

মা জোর না করলে কোনোদিনই বিদেশে আসতাম না।

খোলা হাওয়ায় একটা গাছের মতো ডালপালা মেলে বাড়তে দিয়েছিলেন আমাকে। শাসনের ধরণটাই ডিফাইন করা যেতো না।

“উচ্ছে খাবো না মা রোজ রোজ! আজ আমি জাস্ট ইলিশ দিয়ে ভাত খাবো। কেন এরকম করছ মা? ইটস মাই ফেভরিট!”

“নিশ্চয়ই ইলিশ তোমার ফেভরিট, সেইজন্যই রান্না হয়েছে। কিন্তু তার সাথে উচ্ছে না খাওয়ার কি সম্পর্ক? বাড়ির সবাই খেলে তুমি কেন খাবে না? তুমি আলাদা ট্রিটমেন্ট দাবীই বা করছো কেন আর পাবেই বা ভাবছো কেন”?

নো উচ্ছে। নো ইলিশ।

দশমিনিট দেখবেন। তারপর থালা তুলে নিয়ে চলে যাবেন।

অপমানে কতদিন হয়েছে না খেয়ে উঠে গেছি। নিয়মের হেলদোল হয়নি।

একবার যেদিন কল করবো বলেছিলাম সেদিন করতে পারিনি। বন্ধুদের সাথে বকতে বকতে দেরী হয়ে গিয়েছিলো। পনেরো দিন কথা বলেননি। আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর জল ঝরেছে তাও বলেন নি।

“আমি যদি তোমার প্রায়োরিটি না হই, তুমিও আমার প্রায়োরিটি নও। হতে পারো না”।

হৃদয়টা ছিল সাগরের মতো।

যাঁরা আমাকে বড় মনের বলেন তাঁরা মাকে দেখেননি।

 

আজ সকাল থেকে বাড়িতে ছিটেফোঁটা জল নেই। মাথা ঘেঁটে গেছিল একেবারে। তার ভেতরেই থেকে থেকে মনে হচ্ছিল কি যেন একটা মিস হয়ে যাচ্ছে।

“তোমার এক একেকটা সার্টিফিকেটে একেকটা ডেট মা। কোনটা ঠিক বলো তো”?

“আমাদের সময় এই গোলমালটা খুব হত জানিস। অনেক ছেলে মেয়ে থাকতো তো, বড়রা প্রায়শই গুলিয়ে ফেলে ভুলভাল দিন এর ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেন”।

তারপর মিটিমিটি হেসে জানিয়েছিলেন দিনটা।

২৬শে জুন।

হ্যাভ আ গুড ওয়ান। মা।

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: