সব লিখেছে এই কেতাবে (২)

শুক্রবার সকাল।

ল্যাব মিটিং  চলছে হু হু করে। জনগণের মাথা থেকে আজবতম আইডিয়া উৎসারিত হচ্ছে , হাসি হাসি মুখ করে শুনছি আর মাথা নাড়ছি  হঠাৎ মনে হল বহু দূরে কোথাও কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে।

চমকে দেখি ঠিক উল্টো দিক থেকে স্থির তাকিয়ে আছেন গুরুজি “ইন্দ্রাণী-তানিয়া, ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম? তোমরা এই মুহুর্তে ঠিক এই জগতে আছ বলে মনে হচ্ছে না। ইউ ক্যান গেট ইয়োরসেলফ সাম কফি  ইফ ইউ ওয়ন্ট কিন্তু সিনিয়রদের কাছ থেকে ল্যাব মিটিংয়ে জাস্ট ফাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকবার চেয়ে সামান্য বেশি ইনপুটস বাকিরা আশা করে! আজকাল তো আবার দেখছি লোকজন মিটিং এ না থাকলে একবার জানানোর ও প্রয়োজন বোধ করছে না”!

নিজেদের ধুলোয় লুটোনো প্রেস্টিজ পুনরুদ্ধারের বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা না করে দিমিত্রি পরিত্রাণে হাঁ হাঁ ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা –“আরে রিকার্ড, লিসন লিসন! দিমিত্রির সকাল থেকে খুব শরীর খারাপ কিনা। এই একটু পরেই এসে পড়লো বলে”!

“অদ্ভুত তো! তোমরা জানতে তো এতক্ষণ চুপ করে ছিলে কেন? কিরকম শরীর খারাপ?”

ততোক্ষণে তানিয়া হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে; আর আমি তো আজ অব্দি কোনও মিথ্যে কনভিনসিংলি বলতে পারিনি। জিভে র‍্যাশ বেরিয়ে যায়।

“ইয়ে মানে পেটে ব্যথা। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। নাথিং সিরিয়াস”!

“ওকে। ফাইন। নাও কনসেনট্রেট। প্লিজ”।

আরে! কনসেনট্রেট করো বললেই হল? অনুশোচনায় পাগল পাগল লাগছে তখন।

নাহ কোয়ালিটি নিয়ে ইয়ার্কি করাটা খুব ভুল হয়ে গেছে। সত্যি যদি কোয়ালিটি টেস্টে ফেল করে ছেলেটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। যতই বাচ্চা হোক, ইগোটা যাবে কোথায়? আমাদের এমন সুন্দর বন্ধুত্বটাই না নষ্ট হয়ে যায়”!

মিটিং শেষে বিমর্ষ চিত্তে ডেস্কে বসে থাকি দুজনে।  বসেই থাকি। কোনও কাজে মন লাগবে না বুঝে ওঠবার নামগন্ধও করি না।

অন্তত ঘন্টাখানেক ক্যাবলা হয়ে বসে থাকবার পরে দেখি আস্তে আস্তে কখন ঘরে ঢুকেছে সে।  মুখটা শুকিয়ে ছোট্ট, ব্যাগটা চেয়ারের ওপরে কোনও রকমে ঝুলিয়ে দৌড় ওয়শরুমে।

তানিয়া ডেনমার্কের মেয়ে। ওখানকার সোজা রাস্তাগুলোর মতই সোজা কথা সোজা করে বলে।

“তোর গলাটা আমার টিপে দিতে ইচ্ছে করছে জানিস। সব কিছুতে ইয়ার্কি। সব কিছুতে মজা খোঁজবার অপচেষ্টা। বোঝ এখন। ও আর আমাদের মুখ দেখবে না রে। তুই কোথাকার কোয়ালিটি অ্যানালিস্ট এসেছিস?”

আমার চরিত্রে বহু গুণের মধ্যে একটা, ঝগড়া করবার সময় আমি সুপার লজিকাল হয়ে যাই।

“দ্যাখ ভাই তানিয়া, মানছি কথাগুলো আমার মুখ থেকে বেরিয়েছে, কিন্তু তোর হাসির শব্দ তো পাহাড়ের নীচ থেকে শোনা যাচ্ছিলো। এত তত্ত্বকথা কোথায় রেখেছিলি মা তখন?”

একটু থেমে আবার যোগ করি “ নিজেদের ভেতর ঝামেলা করে কি হবে বল। লেটস ফেস ইট টুগেদার”।

তানিয়া লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘাড় হেলাতে না হেলাতেই দিমিত্রির প্রবেশ।

ছোটবেলায় বাবা অফিস থেকে ফিরলেই আমি লাফিয়ে কোলের কাছে পৌঁছে যেতাম আর ঠাম্মা বলতেন “আহ!  বাবা বাড়িতে এলেই ওরকম করতে নেই। একটু জল খেয়ে বিশ্রাম করতে দাও। তারপর যতো ইচ্ছে জ্বালিয়ো”!

বলাবাহুল্য বাবা-মেয়ে কেউই সেই টিপস সারাজীবনে ফলো করেনি বিশেষ।  কিন্তু এখন এই  ঘোর বিপদকালে ঠাম্মার স্মরণ নেওয়াটাই বেটার বলে মনে হওয়ায়, সাততাড়াতাড়ি জলের বোতলটা এগিয়ে দিই ওর দিকে।

চোঁ চোঁ করে অর্ধেক খালি করে বোতলটা আবার আমার হাতেই ফিরিয়ে দেয় ছেলেটা।

তারপর কোনও একসময় অস্বস্তিকর নীরবতার বিচ্ছিরি মনুমেন্টটাকে চৌচির করে নিজেই বলে ওঠে “হল না”।

বলতে বলতেই বুঝি খেয়াল করেছে পলকে ছাইবর্ণ হয়ে গেছে দুটো মুখ ।

“আহ! না। তোরা যা ভাবছিস তা নয়। টেস্টটাই দিতে পারিনি আজ”।

একটা তুচ্ছ বাক্যের যে কি শক্তি সেদিনের চেয়ে ভাল আর কখনো বুঝিনি। পালকের মতো হালকা মনে হচ্ছিলো নিজেকে আর সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় যে ভূতটা সারাক্ষণ বদমাইশির দাদরা-কাহারবা বাজায় সেটাও মহা পুলকে আবার নতুন করে ধা-ধিন-ধিন ধা জুড়ে দিলো।

তানিয়ায় কটমটে চাউনিটাকে যতোটা পারা যায় অগ্রাহ্য করে নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করলাম “হ্যাঁরে ইয়ে তা টেস্টটা হল না কেন”?

বুক ভেঙ্গে দেওয়া টাইপ গভীর এক দীর্ঘশ্বাস সহকারে উত্তর এল “সেই সাড়ে আটটায় পৌঁছে গেছি বুঝলি”।

“তারপর”? –তানিয়ার স্বর বাতাসে মিলিয়ে গেলো প্রায়। টেনশনে।

“তারপর আর কি।  টানতে টানতেএকটা পুঁচকে ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। ঘরের দেওয়াল জুড়ে শুধু মেয়েদের ছবি।  কিরকম ছবি বুঝতেই পারছিস।  সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে বারোটা সবকটাকে ঘুরে ঘুরে দর্শন করলাম বাট আই ফেইল্ড টু প্রভাইড দ্য স্যাম্পল”।

“কোথাকার আকাট রে তুই”? যারপরনাই বিরক্ত হয়ে বলে ফেলি।

“ বলবি তো ইট ডাজন্ট ওয়ার্ক দ্যাট ওয়ে ফর ইউ”?

“চেষ্টা করেছিলাম জানিস। খুব। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারলাম না। ওরা কিছু ভাবে যদি”?

“কি আবার ভাববে? এটা তোদের ওই কনসারভেটিভ ইউরোপ নয়।  দিস ইজ নর্থ অ্যামেরিকা। সারা পৃথিবী থেকে লোক আসে মন্ট্রিয়ল গে ভিলেজে। আহাম্মকের মতো ব্যবহার করেছিস”।

মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকে ছেলেটা। অনেকক্ষণ পরে আবছা গলায় বলে “তোকেই কি বলতে পেরেছিলাম? মনে পড়ে কিছু?”

মনে তো পড়েই। তানিয়ার বার্থডে পার্টি। কত রাত খেয়াল নেই আজ আর। সেদিনও ছিল না।  অতগুলো শটসের পর নিজেকেই মানুষ ভুলে যায় তো অন্য কিছু! কে দিমিত্রি,কোথাকার দিমিত্রি কিস্যু মগজে নেই।

ঠিক সেই মুহুর্তেই নিজের জীবনের সবচাইতে গোপন কথাটা শুনিয়েছিল আমায়। “তোকে বন্ধু মনে হল। তাই বলতে চেয়েছিলাম। বলেছিল কেন ছেড়েছে নিজের দেশ। কি যন্ত্রণা দিয়ে আঁকছিল মায়ের চোখের জল, বাবার অচেনা দৃষ্টি, বোনের তীব্র অভিমান আর নিজের অসহায়তার মর্মান্তিক দৃশ্যগুলো-একের পর এক।

রাত ভোর হয়ে গিয়েছিল কখন বুঝতেও পারিনি। অত জীবন্ত  হ্যাং ওভার আর কখনো যেন না হয় আমার।

বন্ধুই ছিলাম। আজও আছি।

ফ্রান্সের ছোট্ট একটা শহর থেকে একদিন কথা বলেছিলেন দিমিত্রির মা। ধন্যবাদ জানাতে। ছেলের যখন তখন ব্লাইন্ড ডেটের ভয়ংকর বিপজ্জনক নেশাটা  ভিনদেশী দুই কন্যা ছাড়িয়ে দিতে পেরেছে বলে।

আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে করতো যেটা। সময় লেগেছিল, সাংঘাতিক রাগ হত একেক সময় কিন্তু হাল ছাড়িনি।

আমি হাত তুলে নেব বললে তানিয়া সামলাত, তানিয়া খেপে গেলে আমি।

এক বছরের ওপর হয়ে গেলো ফ্রান্সে ফিরে গেছে দিমিত্রি। ডিগ্রি নিয়ে, মাথা উঁচু করে। ব্যাঙ্কে ভাল কাজ করছে।

বাবা-মা-বোন ও বুঝেছেন আস্তে আস্তে- যা বোঝবার।

আর হ্যাঁ , স্পার্ম ডোনেশানের মহৎ ইচ্ছেটাও হৃদয় থেকে সাকসেসফুলি সাফ করে দিতে পেরেছিলাম।

কদিন আগে পিং করে বললাম “তোকে নিয়ে ব্লগে লিখি”?

একরাশ স্মাইলি নিয়ে উত্তর এল “এনিথিং ফর ইউ”।

এক টুকরো জীবন।  যা আমি ল্যাবেই রেখে এসেছি।

Advertisements

One Comment

Add yours →

  1. an unusual expirence but expressed in unique way.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: