সব লিখেছে এই কেতাবে (১)

“আধ ঘন্টাও আলাপ হয়নি তোমার সঙ্গে বাট আই হ্যাভ টু টার্ন অফ দ্য লাইট, ইউ সি। ওয়েল আই ওন্ট টাচ ইউ, প্রমিস”!

আমার বজ্রাহত অবস্থাটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে বিচ্ছিরি হাসতে লাগলো ছেলেটা।

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে এইসব বিদঘুটে কথাবার্তা আর হি হি ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে আমি যখন প্রায় অবশ, সে পাশে এসে বসলো। হাতে গুচ্ছ খানেক সল্যুশন।

কি হচ্ছে কিছু বুঝতেই পারছিলাম না খালি থেকে থেকে একটা কথাই মনে হচ্ছিল যে  ওই সযত্নে বানানো টাকে পটাং পটাং গোটা দশেক চাঁটি মারতে পারলে হয়তো একটু বেটার লাগলেও লাগতে পারে।

“আমি তো কিচ্ছু দেখতেই পাচ্ছি না তুমি কি করতে যাচ্ছ? শেখা তো দূরের কথা!”- আমার ক্ষীণ গলায়  কণামাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে আপন মনে এটা ওটা মেশানো চলতেই থাকলো।  সাথে অবিরাম বাক্যালাপ- “মরতে আর কিছু ইচ্ছে হল না? কে বলেছিল বায়োফিজিক্স পড়তে? আবার ফ্লুওরেসেন্সের কাজ! ফেসবুকের ওই কায়দা করা স্মোকি আইজ লুক দুদিনেই ঘুচল বলে খুকুমনি। এই অন্ধকারে থেকে থেকে একসময় সুন্দরী পেঁচা হয়ে যাবে। আর দিবা নিশি ফারাক করতে পারবে না। চোখের কোণে এইসা কালি পড়বে! বায়োফিজিক্স হুঁ”!

মাথায় রক্ত উঠে গেছে ততোক্ষণে। কোনও রকমে ঠোঁট থেকে ফিরিয়ে নিলাম কথাটা ““আধ ঘন্টাও আলাপ হয়নি কিন্তু এর মধ্যই আমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করে ফেলেছ! বাহ বাহাদুর খোকা বলতে হবে”!

বলিনি যে তার দুটো কারণ।  এক তো “কাট-ওপেন ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প ফ্লুরিমেট্রি নামক সুপার কমপ্লিকেটেড টেকনিকটা আমাকে এই বান্দার থেকেই মগজায়িত করতে হবে। দুই ওই অন্ধকারে কামড়ে টামড়ে দিলে?  একে তো একবারেই সুস্থ বলে মনে হচ্ছে না!

“দুদিন পরেই অভ্যেস হয়ে যাবে অন্ধকার। মাথা আর চোখটাও অ্যাকসেপ্ট করে নেবে এই অত্যাচার। হাতগুলোও ডাইনে-বাঁয়ে নিখুঁত কাজ করবে। শুধু কফি ছাড়া বাঁচতে পারবে না”- নিজের মনে বক্তৃতা চলতে থাকে।

“কফি আমি ছুঁয়েও দেখি না”- আর থাকতে না পেরে প্রতিবাদ করে ফেলি।

আর তারপরেই- সে কি হা হা হাসি। “ ওরে কে কোথায় আছিস? শুনে যা। এই বেবিটা চা-কফি ছোঁয় না! আর ফ্লুওরেসেন্স ঘাঁটবে! হা হা হা হা!! গ্রো আপ কিডো”!

সেই শুরু।

বহু-বহুদিন পর্যন্ত জর্জকে সহ্যই করতে পারতাম না আমি।

কিন্তু ওই একটা কথা প্রোফেটের মতো মিলিয়ে দিয়েছে একেবারে। শিরা-ধমনীতে ক্যাফিন বয় এখন।

“ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই ফুড আগেইন,জর্জ”?

“থাম বাবা। অনেক হয়েছে। তোর আবার ফুড! সেটা নাকি চুরি করতে হবে! খাচ্ছিলি তো চিপস। আমি ভাবলাম আর খাবি না। নষ্ট হবে তাই—-!”

এলিস না এসে পড়লে আটশ নিরানব্বইতম মারামারিটা লেগেই যেতো নির্ঘাত।

এক টুকরো জীবন। যা শুধু ল্যাবেই রয়ে যায়।

***************************************************************************************

“ইন্দ্রাণী! ওয়াও! আই গট আ ওয়েট ড্রিম লাস্ট নাইট! আই নিউ ইউ’ল লাভ ইট!”

খুব স্বাভাবিক কারণেই আমার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করেছে ততোক্ষণে। লাল লাল মুখে শক্ত গলায় “হোয়ট ডু ইউ মিন” বলতেই বক্তা বুঝে ফেলেছে কেস গড়বড়।

হোঁচট খেতে খেতে কোনোরকমে জোড়ে পরের লাইনটা “ রেন-লাস্ট নাইট- আই গট ওয়েট- অ্যানড সেম ড্রিম- ইউ লাভ রেন-সো টোল্ড- স্যরি”!

পরের দশমিনিট ঘাড় ধরে উইকি সার্চ  “কিছু বুঝলি গর্দভ?”

আর  হেসে কুটোপাটি হতে থাকে দিমিত্রি “দেসোলে মাদমোয়াজেল দেসোলে” বলবার ফাঁকে ফাঁকে।

আরেকদিন। তানিয়া আর আমার বকবকের মাঝে যথারীতি হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসে একামেবাদ্বিতিয়ম ওয়ান অ্যান্ড ওনলি দ্য দিমিত্রি।

“আই নিড সাম কুইক মানি। একটু হেল্প করবি?”- গম্ভীর ঘোষণা।

“আমাদের দেখে কি টাকার গাছ বলে মনে হচ্ছে তোর? ধার ফার দিতে পারব না কিন্তু। ভাগ”!

“ধ্যাততেরিকা! তোদের কাছে টাকা চাইতে যাবো কেন?  কাল একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আহ ভালয় ভালয় হয়ে গেলেই আমি বড়োলোক! কিন্তু কাল সকালে ল্যাব মিটিং তো। ডুব মারতে হবে বুঝতেই পারছিস। গুরুদেবকে একটু সামলে নিস তোরা। বিয়ার খাওয়াবো !”

“কিসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট”?- ছেলের পুরনো ট্র্যাক রেকর্ড বিশেষ সুবিধার না হওয়ায় আড় চোখাচোখি করি আমি আর তানিয়া।

আর সেটা  অনায়াসে পড়ে ফেলে হইহই করে ওঠে পাজিটা।

“না রে। তোরা যা ভাবছিস সেরকম কিছু না”!

ছোট্ট পজ।

“ভাবছি স্পার্ম ডোনেট করবো। সমাজের উপকারও হবে আর আমিও নিশ্চিন্তে পকেট বোঝাই করে ব্লাইন্ড ডেটে যেতে পারবো”!

“কাল যাচ্ছিস যা। কিন্তু ওরা তোরটা নেবে না”- থাকতে না পেরে সত্যি কথাটা বলেই ফেলি এবার।

“কেন? কেন নেবে না”? মারমার করে ওঠে দিমিত্রি।

“ওরা কোয়ালিটির ব্যাপারে খুব ফাসি হয়। আর তুই চেন স্মোকার। আরও কি কি করেছিস একটু স্মরণে আন। ইন মাই ওপিনিয়ন ইউ ডোন্ট স্ট্যান্ড আ চান্স ডিয়ার”।

“তুই থামবি? এইজন্যই ইন্ডিয়ানগুলোর ওপর আমার এত রাগ। সকিছুতে ব্যাগড়া দিতে ওস্তাদ”-গজগজ করতে করতে হাঁটা লাগায় বেচারা আর আমাদের দুজনের এতক্ষণের আটকে রাখা হাসিটা দমকে দমকে বেরিয়ে আসতে থাকে।

এক টুকরো জীবন। যা শুধু ল্যাবেই রয়ে যায়।

চলবে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: