মিমি

“এই শোন, তুই বাংলায় লিখছিস? সত্যি সত্যি? সবাই কিরকম পড়তে পারছে আর আমাকে তাদের থেকে শুনতে হচ্ছে! অথচ তুই! কেন দিচ্ছিস না লিঙ্কটা? আমি ফেসবুকে নেই বলে এটা কি রকমের অত্যাচার তোর বল দেখি? এর চাইতে যখন ইন্ট্যারনাশনাল বিজনেস টাইমসের হয়ে লিখতিস আমি কিরকম সব পড়তে পারতাম। তোর মত একটা বিচ্ছিরি মেয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত না”!

“ওগুলো সায়েন্টিফিক রাইট আপ তো তাই যাই লিখতাম না কেন, একটা মানে দাঁড়াত কিন্তু পেনসিলের কোনও মাথামুণ্ডু নেই বিশ্বাস করো ! তার ওপর তুমি আবার সংস্কৃতের ছাত্রী! প্লিজ পেনসিলটা অ্যাভয়েড করো!  তোমার জন্যও। আমার জন্যও। চলো অন্য কথা বলি!”

“দেখেছিস তো কিরকম পাজি তুই! কথা ঘোরাতে চ্যাম্পিয়ন! এত লাজুক কেন?  কত লোক পড়ছে আর আমি পড়লেই লজ্জা! ঠিক আছে। আই’ল ওয়েট। তুই নিজে না পাঠালে পড়বোই না”।

ওপরের এই কনভার্সেশনটা সপ্তাহে অন্তত দুবার হয়ে থাকে আমাদের মধ্যে! কিন্তু ভদ্রমহিলা আমাকে কখনো জোর করেন না এর চাইতে বেশি- কারণ তিনি আমাকে খুব ভাল করে চেনেন। আমি নিজে বুদ্ধুর মতো অন্ধকারে টাল খাই যখন কি অনায়াসে দেখিয়ে দেন। সোজা রাস্তাটা।

শুরুটা হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে। ২০১১ র অক্টোবরের এক সন্ধ্যে। পরের দিন থেকে দুর্গাপুজো। ময়ূখ টানতে টানতে নিয়ে গেছে যোগাড়যন্ত্রে হেল্প করবার জন্য। কিছু চেনা-স্বল্প চেনা-ফুল অচেনা মুখের জটলাটাকে যখন সাংঘাতিক রকম কনফিউজিং লাগছে ঠিক তক্ষুনি কাঁধে একটা আলতো ছোঁয়া।

“তুই ইন্দ্রাণী? তুই ই? আরে কবে থেকে বলছি এই মেয়েটাকে একটু দেখতে চাই। তা তোর পাত্তাই নেই! কি মিষ্টি দেখতে রে তোকে! মিটিং এ আসিসনি কেন?” প্রায় বলে ফেলছিলাম যে “আমার মতো অপদার্থ প্রাণী মিটিং এ এলে তোমাদের গুচ্ছ কফি ধ্বংস করা ছাড়া আর বিশেষ কিছু কাজের কাজ হত না!” কিন্তু তিনি সে কথা শুনলে তো! পরক্ষণেই সাবজেক্ট বদলে ফেলেছেন।

বহু পরে কবুল করেছিলেন “তোকে অত ভাল লেগেছিল কেন জানিস? অনেকদিন বাদে অত  সোজাসাপটা কথা শুনেছিলাম। তখনি জানতাম এই মেয়েটা একেবারে অন্যরকম”।

এত কথা লেখবার উদ্দেশ্য কিন্তু আমি কত “অন্যরকম” সেটা ঘোষণা করা নয়। সত্যি কথাটা হচ্ছে আমার খুব মন কেমন করছে। খুব

। মা চলে যাবার পর কারুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করতো না, কিন্তু ফোন আসবার বিরাম নেই। সকলেরই কিছু না কিছু বলবার আছে। আর সেটাই স্বাভাবিক। রাগের চোটে মনে হত ছুঁড়ে ফেলে দি ফোনটা। কিন্তু কেন এত রাগ হচ্ছে কিছুতেই বুঝতে পারতাম না।

শুধু এই একজনের সাথে কথা বলতাম। প্রতিদিন। “তোর এত কেন রাগ হচ্ছে জানিস? কারণ তুই কারোর সিম্প্যাথি চাস না। ইউ সো ডেস্প্যারেটলি ওয়ণ্ট দ্য ওয়র্ল্ড টু  ট্রিট ইউ নরম্যালি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই তো বুঝবে না সেটা। ইচ্ছে না হলে ফোন একেবারে ধরিস না”।

ঝরঝর করে চোখ থেকে জল পড়েছিল সেদিন। মা বিন দুনিয়ায় প্রথমবার।

আরেকবার। কি একটা ঘটনায় ভয়ঙ্কর বীতশ্রদ্ধ হয়ে বলেছিলাম “দেখো বাবা। চারপাশে যা দেখছি কোনোদিন যেন বোলো না তুমি আমাকে যা ভেবেছিলে আমি তা নই। সেটা শোনবার আগে কালা হয়ে যেতে চাই”।

আবার সেই খিলখিল। অনেক ধমকানোর পর কোনোরকমে হাসি থামিয়ে উত্তর এল “ তোর ব্যাপারে সেটা বলা খুব মুশকিল রে।  তোর অ্যাপ্রোচ হচ্ছে আইদার তুমি ম্যাটার করো না হয় করো না। করো না মানে একেবারেই করো না। এতে ভুল বোঝাবুঝির চান্সই নেই! কিন্তু ঝামেলাটা হয় তুই হেসে কথা বললি, লোকে ভাবল কেল্লা ফতে। তারপর কদিন বাদে দেখল তুই তাকে দেখলে হাই তুলিস। সে কি করে ভাল কথা বলবে তোর নামে বল”!

“তাই বলে বলবে আমার এতো অ্যাটিটিউড আমি নাকটা আকাশে তুলে রাখি?!”

“বলেছে বুঝি? আহা তা বলতে নেই তোর নাকটা বেশ…!!”

এত কথা লেখবার উদ্দেশ্য কিন্তু আমার নাকটা কিরকম সেটা জাহির করা নয়। সত্যি কথাটা হচ্ছে আমার খুব মন কেমন করছে। খুব।

“তোমার শরীর ভাল নেই কেন বলোনি আমায়? কেন?”

“আরে দেখ কিরকম পাগলামি করিস। এই জন্যই তো আগে বলিনি। এখন ঠিক হয়ে গেছে তাই বললাম। ভয় পাস কেন এত? আই ওন্ট লিভ ইউ। কিন্তু তুই কি করে বুঝিস বল দেখি। একটু শরীর গোলমাল করলেই ধরে ফেলিস। আর আমাকে কাঁড়ি কাঁড়ি মিথ্যে বলতে হয়!”

কদিন আগেই হারিয়েছেন নিজের মাকে। ইন্ডিয়া যাবার দিন সকালে বলেছিলেন “ আমার জন্য শুধু এটুকু প্রার্থনা করিস যে মাকে যেন একবার দেখতে পাই। তুই আমার জন্য কিছু চাইলে  কক্ষনো সেটা বৃথা যাবে না”।

যিনিই হোন আমার এই কথাটুকু রাখবার জন্য আজীবনের কৃতজ্ঞতা।

গত শনিবারের কথা। ছুটি ছিল না আমার। কাজ শেষ করে যখন বেরোই মাথাটার সার ফিরতে তারপরেও লেগে যায় বেশ কিছুক্ষণ। ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম, দুটো মিসড কল ছিল সেটাও নজরে এসেছিল কিন্তু রেজিস্ট্রার করেনি।  ভেবেছি বাড়ি ফিরে কল ব্যাক করবো।

মেট্রো থেকে বেরিয়ে ডায়াল করতেই চেনা গলা “আসলে কি বলতো ভীষণ মন খারাপ করছিল তোর জন্যে। ঘণ্টাখানেক বসেছিলাম গাড়িতে ডাউন টাউনে। তোকে একটু দেখব বলে। কিন্তু তারপর এমন বৃষ্টি এসে গেলো। আর উইকেন্ডে পার্কিং পাওয়া এত কষ্ট”!

“তুমি আমার সাথে দেখা করবে বলে মন্ট্রিয়েল এসেছিলে”?

আমার আর্তনাদে সদাহাস্যময়ীর স্বরটাও বিষণ্ণ হয়ে আসে “হ্যাঁ রে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো। এরপরেও বেশ কিছুদিন দেখা হবে না তো। তুই যদি বেরিয়েও একবার কল করতিস! এই পাগল মেয়ে। কাঁদছিস কেন? এসেই তো দেখা হবে। ফিরেই।”

জীবনে কিছু কিছু সম্পর্কের কোনও ব্যাখ্যা হয় না। কেন হল, কিভাবে হল কেউ জানে না, জাস্ট হয়ে যায়।

“অসম্ভব রেগে গিয়েছিলাম একবার। কেন বলনি আমাকে এ কথা আগে? তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? কেন বলনি?”

“এইজন্যই বলিনি। কিরকম খেপে গেছিস দেখ। মেয়ে মা কে সব কথা বলবে। বলতেই হবে। তাই তুই আমাকে সব বলবি। কিন্তু মা থোড়ি না সব কথা মেয়েকে বলেন! তাই আমি তোকে  সব বলব না! কোনোদিন না!”

আজকেও দৌড়ে দৌড়ে ফিরেছি। সকালে কথা বলবার সময় ছিল না। এখন বলতেই হবে।

ইনবক্স বলছে “ ফোনটা আনতে কি করে যে ভুলে গেলাম! এয়ারপোর্ট থেকে লিখছি। আজ কথা হল না। ভাল থাকিস। আই উইল মেল ইউ”। তিন সপ্তাহের ক্রুজ।  ইউরোপ। রাশিয়া।

আই নো শী’ল রাইট টু মি। কিন্তু মন কেমন করছে তবুও। মাসি বলে ডাকি। মা মনে করি। জায়গাটা কেউ কাউকে জোর করে দেয়নি। এটা যেন হওয়ারই ছিল।

পেনসিল নাই বা পড়তে দিলাম। কিন্তু এটা তোমারি জন্য। মিতামাসি।

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. very touchy.another nice piece.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: