হাতে রইল পেনসিল

জীবনের কাছ থেকে বেশ কয়েকবার ঘাড় ধাক্কা খাওয়ার পরে প্রতিবারই যখন ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে উঠে বসেছি, দেখেছি আমার চারপাশটা যন্ত্রণায় অবশ হয়ে থাকলেও সেটাতে চন্দ্র-সুর্যের বিশেষ কিছু যায় আসেনি- ভবিষ্যতেও আসবে না।

এই সার সত্যটি মগজায়িত হয়ে যাবার পর থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে এরপর থেকে যাই হোক না কেন নিদারুণ শক বোধহয় আমার আর কোনওদিনই কোনোকিছুতেই লাগবে না।

বিশ্বাস হয়েছে নয়। হয়েছিল।

চুরচুর হয়ে ভেঙ্গে গেছে সমস্ত ধারণা।

ভয়াবহ শকড হয়েছি আবার।

আমাকে দিয়ে কেউ ফুড ব্লগ লেখাতে চায়?

প্রথমে ভেবেছি ভুল মেসেজ পাঠিয়েছে। “তুমি যার সাথেই কথা বলতে চাও না কেন আমি কিন্তু সে নই” জানানোতে উত্তর এল “না। না। তুমিই সেই। তোমাকেই বলছি”।

এপ্রিল চলে যাবার আড়াই মাস পরে কেউ এপ্রিল ফুল করবে না, আর বেশ চেনা লোক তো আরই না। আমি খুব শান্তশিষ্ট নই সেটা জনতার অবিদিত নয়।

“ইয়ার্কি করছ নাকি? আমি তোমার ফুড ব্লগ লিখলে তোমার ব্যবসা অচিরেই চাঁদ তারা দেখবে”।

তুমি থেকে এবার তুই এ নেমে আসে সে।

“ওরে শোন না। ছবি টবি আর বাকি যা মেটিরিয়াল সব আমি সাপ্লাই করব। তুই শুধু লিখবি। প্লিজ”।

“তোমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ কখনোই লাগেনি কিন্তু এরকম অতি উন্মাদও বোঝা যায়নি”-

টাইপ করে অপর পক্ষকে ডিফেন্ড করবার বিন্দুমাত্র অবকাশ না দিয়ে লগ আউট করে দি। সন্ন্ধ্যেবেলা দেখি এক কিলোমিটার লম্বা একটা মেসেজে আমার যাবতীয় অভিযোগ খণ্ডন করবার পর লেখা আছে  “ তোকে আমি ফ্রিতে মোটেই লেখাবো না। জানি তুমি সে পাত্রীই নও। যা হিসেবী!”

হা হা হেসে ফেলি। কেপ্রিকর্নরা হিসেবী হয় সেটা অস্বীকার করবার কোনও জায়গা নেই কিন্তু তা বলে বাইরে থেকে যেরকম মনে হয় ব্যাপারটা ঠিক সেরকম ও নয়। এনিওয়ে!

“দেখো আমার প্যাশন লিস্টে খাবার বলে কোনও বস্তু নেই। থাকবে বলেও মনে হয় না। আর আমার মনে হয় বিষয়টাই যদি  আকর্ষণ না করে লেখা কখনোই ভাল হতে পারে না। তুমিও খুশি হবে না। আমিও না। লেটস নট গেট দেয়ার”।

“বুঝেছি বুঝেছি। বিফ- পর্ক এসব না হয় তুমি খাও না কিন্তু  মাছ?- বাঙালি বটে তো? মাছের প্রিপারেশন নিয়ে লেখ। আমি বলে দেব তুই লিখবি”।

বিফ? পর্ক? শুনেই শিউরে শিউরে উঠছিলাম এতক্ষণ । বলে কি এ?

ভটচায বামুনের মেয়ে বাওয়া।

ময়ূখ এটা শুনলেই চোখ কুঁচকে যদিও বলবে “ এক্সকিউজের বাবা-মা নেই কোনও। মেন্টাল ব্লক আছে তোমার যে কোনও মাংস নিয়েই। সারাক্ষণ ড্রামা”!

কিন্তু মাছ শুনেই হা হা টা হু হু করে শুকিয়ে গেলো। বলে কি এ?

হ্যাঁ। মাছ আমি খাই। নিশ্চয়ই খাই।

রুই খাই কিন্তু নো কাতলা। নেভার।

কারণটা কিছুই নয়। কাতলা নামটা জাস্ট ভাল লাগে না। আমার মত উন্নত মস্তিষ্কের কোনও প্রাণী কাতলার মত একটা ইডিয়টিক নামের জিনিস খাচ্ছে-এটা মেনে নিতে পারিনি তাই খাই না। কেউ যদি না বলে খাইয়ে দেন বুঝতেও পারব না।  আমার ধারণা বেশ কয়েকজন এই বিশ্বাসসঘাতকতাটা করেছেন আমার সঙ্গে।

হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরেছি ছুটিতে। ঘুম ভেঙ্গে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু মটকা মেরে শুয়ে শুয়ে শুনছি এক দম্পতির প্রেমালাপ।

বাজারে যাচ্ছেন বাবা।

ব্যাগটা মায়ের হাত থেকে নিতে নিতে বলছেন “আরে পাবদা, কাজরী। মৌরলা থাকলে তো নিশ্চয়ই নেব। কিন্তু পাওয়া গেলে তো। আচ্ছা বাটা, ট্যাংরা এরা কি দোষ করেছে বলো দেখি? তুমি রান্না করে দিলে ও ঠিক খেয়ে নেবে। বুঝতেই তো পারে না কিছু শুধু নামে প্রবলেম। এত ফ্যাস্টিডিয়াস মেয়ে। কি যে হবে ওর?”

মুচকি হেসে মা বললেন “ ও জেগে জেগে সব শুনছে। তোমার মেয়েকে কি তুমি চেন না?”

বেরিয়ে যাওয়ার মুহুর্তে বাবা ফিরে তাকালেন, মায়ের মুচকি হাসিটা চোখের তারায় মিশিয়ে যোগ করলেন “চিনি বলেই তো বলছি। এখনো না উঠলে আজ দুপুরে কিন্তু সত্যিই ট্যাংরার ঝোল”!

গরমের ছুটিতে বাধ্যতামূলক ভ্রমণে যেতে হয়েছে এক আত্মীয় দর্শনে। দুদিন যেতে না যেতেই ছুট ছুট বাড়ি।

দরজা ডিঙ্গতে না ডিঙ্গতেই মায়ের জেরা শুরু “এভাবে চলে এলি? ছি ছি! কি ভাবলেন ওঁরা? কত ভালোবাসেন তোকে! ছি! আদর দিয়ে মাথায় তুলেছেন তোমার বাবা। বলতেই হবে কি হয়েছে? কেন চলে এলি এরকম করে?”

কতক্ষণ আর অত ধমক খাওয়া যায়? কাঁদো কাঁদো কনফেশন অগত্যা।

“প্লিজ মা প্লিজ। ওঁরা খুব ভালো কিন্তু মাছ একেবারে কড়া করে ভাজেন না। ডোন্ট ডু দিস টু মি মা প্লিজ”।

মা বুঝেছিলেন এবং ম্যানেজ করেছিলেন অবস্থাটা সেবারের মত। কারণ আমার মাছটা প্রতিদিন থালায় দেবার আগে মাকেই অন্তত তিনবার ভাজতে হত।

এবার কলকাতায় ছলছল চোখে কমলা মাসি বলছিলেন “ মাছ খাবে না কেন? একজন নেই ঠিকই কিন্তু আমি জানি না বুঝি তোমাকে দিতে হলে কতোটা কড়া করে ভাজতে হবে?”

“এসব কথা কি ফুড ব্লগে চলে বলো”?- বাক্যটি লিখে ফাইনাল কংক্লুশন ড্র হয়ে গেছে ভেবে সবে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াতে যাব- অমনি টিং টিং ।

“ঠিক আছে। ঠিক আছে। এসব মাছ নিয়ে লিখতে হবে না। বাট হোয়াট অ্যাবাউট পমফ্রেট? পমফ্রেট ভালবাসে না এমন মহামানব এখনো গোকুলে বাড়ছে”।

“পমফ্রেট? ডিড ইউ জাস্ট সে পমফ্রেট”?

আমি আছি কিন্তু গল্প নেই এরকম কি হতে পারে?

শনিবারের বিকেল। সারাদিন গানের ক্লাসে উত্তাল রিহার্সাল শেষে যখন দমদমে ছোটমামার বাড়ি ঢুকছি জলন্ত খিদে ছাড়া আর কোনও ফিলিং যে দুনিয়ায় এক্সিস্ট করতে পারে সেই বোধটাই লোপ পেয়েছে।

“মাইমা…!”

দৌড়ে এলেন মাইমা।

“দিচ্ছি। দিচ্ছি”। হাতটা তো ধুবি আগে”!

টেবলে রাখা এটা ওটার ঢাকনা খুলে দেখছি আর নিজের মনেই নাক কুঁচকচ্ছি কোনটা চলবে আর কোনটা নয়। হাসি হাসি মুখে মাইমার পুনঃপ্রবেশ।

“শোন না।  পমফ্রেটের দারুণ একটা প্রিপারেশন করেছি। খুব ভাল লাগবে তোর”।

বলতে বলতেই আমার মুখের উত্তরোত্তর রঙ বদলটা নিশ্চয়ই চোখ এড়ায়নি তাঁর।

“আমি? পমফ্রেট? ভালবাসি? মানে”?

থমকে যান মাইমা।

“আরে আমিও তো তাই জানতাম। পমফ্রেট তুই ছুঁয়েও দেখিস না। কিন্তু সনু যে বলল “মা ও আজকাল পমফ্রেট খুব ভালবেসে খাচ্ছে! তোর জন্যই তো বানালাম রে”!

সনুকে আজও ক্ষমা করিনি।

এই কাহিনীর পরেও রেহাই মেলেনি পুরোপুরি।

“ইউ হ্যাভ গট আ বিগ সুইট টুথ; দ্য ওয়ার্ল্ড নোজ। ডেসার্ট নিয়েই লেখ তাহলে”।

লিখতে রাজি হতেই হয়েছে।

কিন্তু বেনামে! অগত্যা!

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. abar akta besh mojar lekha. enjoy korlam

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: