ফর্ম আর ফর্মূলা

“সেন্ট লরেন্সে ডুবে মর” জাতীয় হাহুতাশ ফ্রেঞ্চে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি খুব সম্ভবত, তাই শুদ্ধু একটা যুতসই এক্সপ্রেশনের অভাবেই যে আমার বন্ধু চুপ করে গেলো সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল।  কিন্তু ওই লজ্জা ধিক্কার আফসোস অবিশ্বাস মেশানো দৃষ্টিটার জোরই বা কম কিসে?

সে চোখে চোখ রাখতে না পেরে মাটির দিকে অখণ্ড মনোযোগে তাকিয়ে থাকাটাই বেটার অপশন মনে হল আমার।

“এবারও ? মানে এবারও না? বল শুনি এক্সকিউজটা কি ২০১৫ তে”? দাঁতে দাঁত চেপে শুধায় বন্ধু।

“ওটা তো বদলায়নি। এক্সকিউজটা ২০১০ য়েও যা ছিল আজও তাই। এসব জিনিসে আমার কথার নড়চড় হয় না কক্ষনো। কি করে যাবো বল। পয়সা থাকলে তো যাবো!”

যেই না বলা এতক্ষণের সাইলেন্ট গজগজ বজ্রগর্জনে রূপান্তরিত হয়।

“তোর মুখ দেখাও পাপ। যে তুই কিনা আয়ার্টন সেনার আবির্ভাব-তিরধান দিবস পালন করিস, শুমাখারের অ্যাক্সিডেন্টে শোকে পাথর হয়ে জাস্ট জিন টনিকের ওপর থাকতিস, সেই তুই বাড়ি থেকে দু পা দূরে গ্রাঁ প্রি তে যাবি না?  এই নিয়ে পঞ্চম বারের জন্য? তুই কি মানুষ?”

কি করে বোঝাই একে যে চল্লিশ ডলারের টিকিটে মাইল তিনেক দূরত্বে থেকে  বাতাস কেটে উড়ে চলা গাড়িগুলোর সাঁইসাঁই শব্দ শুনতে চাই না আমি। ঈশ্বর দর্শন তো গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড থেকেই করতে হয় না কি? সেটা যতদিন না হচ্ছে—-

কিন্তু সবুরে মেওয়া ফলে টাইপ কোনও প্রবাদ বাক্যও মনে হয় ফরাসিরা ব্যবহার করে না, তাই যাকে বোঝানোর জন্যে এত কান্ড সে একটুও না দমে আরেক সেট কোয়েশ্চেনিয়ার সহকারে আমাকে ফারদার গ্রিল করতে দ্বিগুণ উৎসাহে বসে পড়লো।

“কেন পয়সা নেই শুনি?”

খুবই হিউমিলিয়েটিং প্রশ্ন কিন্তু উত্তরটা যেহেতু জগত জানে এই মুহুর্তে তাই আমারও পেনসিলে লিখতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।

“কোথা থেকে থাকবে? দন্তরুচিকৌমুদীর কেসটা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে চলবে?- সমান তেজে জবাব দিই আমি।

এবার বন্ধুর মাটিতে চোখ রাখবার সেশন। ও তো শুধু আমার নয়,  ময়ূখ বলে সেই  দাঁতের ব্যথায় কাবু ছেলেটারও বন্ধু । সাংঘাতিক কষ্ট পাচ্ছে কদিন থেকে আমার রুমমেট। অসহ্য যন্ত্রণা, গরম জল-নরম জল –দশদিনের অ্যান্টিবায়টিক কোর্স শেষে কোনও সুরাহা না হওয়ায় মনে হচ্ছিল রুট ক্যানাল ছাড়া গতি নেই।

একটা মিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর যদি বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেলো, ইনস্যুরেন্সের খাতা খোলাতে লাগলো আরও দুদিন।

এটা আমার ক্ষেত্রে হলে এই দুদিন লাগতই না। কারণ চোখ কান বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় ডেণ্টাল ইনস্যুরেন্স আমার কস্মিনকালেও ছিল না। অপশনাল থাকায় সবার আগে ওটাকে বিল থেকে বিদায় দিয়েছিলাম।

সে যদি বলেন, এক বিয়ের পরের দিন আক্কেল দাঁত গজানো ছাড়া বত্রিশ ক্যান্ডিডেট আজ অব্দি আমাকে সেরকম ট্রাবল করেনি। টাচউড!!

কিন্তু ওয়াকিবহাল স্থিতধী ময়ূখ চৌধুরী একাগ্রচিত্তে টাকাটি দিয়ে আসছেন। ভাগ্যিস!

কিন্তু তা স্বত্তেও আমাদের ভেতরে আজকাল সর্বক্ষণই কিরকম একটা সর্বস্বান্ত সর্বস্বান্ত ফিলিং কাজ করছে।

এই অবস্থায় ডেটল কিনতে হলে দুবার ভাবছি আর এ বলে কিনা সিবাস্টিয়ান ভেটলকে হাত নেড়ে আসতে।

নাবালক। জীবনসংগ্রাম কি বস্তু এখনো জানে না।

পায়ে জুতো গলাতে গলাতে কি একটা মনে পড়ায় আবার থমকে দাঁড়ায় বন্ধু।

“ঠিক আছে। যাবি না বুঝলাম। কিন্তু টিভিতেও তো দেখতে পাবি না! কি অপদার্থ! একটা টিভি কেনবারও কি পয়সা এতদিনে হয়নিরে তোদের?”- রীতিমত শোকার্ত হয়ে পড়ে সে আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই আমি।

“গ্রাঁ প্রি কি মেসির মস্তানি এনজয় করতে বাড়িতে টিভি রাখতে যাবো কোন দুঃখে? বারশো কদম হাঁটলেই পাব ম্যা্কক্যারল্ড – আমাদের বার্ধক্যের বারাণসী।

সামনে দু গ্লাস বিয়ার- জিতলে উ-লা-লা সঙ্গে সাংগ্রিলা। হারলে- এনিওয়ে খেলায় হারজিত থাকবেই বলতে বলতে গ্রোসারি সারা।

“কি জানিস আমি যাচ্ছি কিন্তু তুই যেতে পারছিস না- আমার কিন্তু খুব মন খারাপ করবে তোর জন্য। আই’ল রিমেম্বার ইউ”।

এক টুকরো ভাল লাগা-

এক ফোঁটা মনে রাখা-

একমাত্র বন্ধুরাই পারে। এমন অনায়াসে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: