না-হিসেবের খাতায়

আজকে পেনসিলের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন শুরুটা এটা ছাড়া আর কিছু দিয়ে হতেই পারে না।

হ্যাঁ। ডি এইচ এল এই একটু আগেই ডেলিভারি দিয়ে গেছে।  গতকালই তারা একটা কেলো করে ফেলেছিল কিন্তু সকালে উঠেই ম্যানেজ করে দিয়েছে সেটা।

মঙ্গলবার, যেদিন কিনা সারা মন্ট্রিয়লে সমস্ত সিনেমা হলে হাফ প্রাইস থাকে, সেদিন সন্ধ্যেবেলা কোন আক্কেলে ওরা রাত্তির আটটার সময় আমার খোঁজে বাড়িতে হানা দিয়েছিল এ আমার জানা নেই কিন্তু মাধবন- কঙ্গনাকে দেখে ঠোঁটের কোণে মিচকি যে হাসিটা আনাগোনা করছিলো তখনো সেটি অচিরেই উধাও হল ফেলে যাওয়া ডেলিভারি নোটটা গোচরে আসায়।

একটাই ভরসা। কাল আরেকবার আসবে।

এটা নিয়ে সারা রাত ঘুম না হওয়ার মত বিষয়ী কোনও কালেই ছিলাম না কিন্তু দিন বদলে গেছে।  ভরপুর বিষয়ী হতে পারিনি এখনো, পারতে চাইও না মন থেকে কিন্তু বিষয় আর ছাড়ল কোথায়।  তাই কিরকম একটা অজানা ছটফটানি থেকেই গেল ভেতরে।

ঘুম থেকে উঠে কফি ছোঁবারও আগে তিনটে সাদা কাগজে বড় বড় করে লিখলাম “ ডিয়ার ডি এইচ এল ডেলিভারি ম্যান, তুমি যদি বাই চান্স ডোর কোড বাজিয়ে আমার সাড়া না পাও, দোহাই আবার কেটে পোড়ো না।  সারাটা দিন মাটি করে আমি বাড়িতেই আছি। তোমার বিহনে চোখে অন্ধকার দেখছি। একটু কষ্ট করে ওপরে উঠে এসে অ্যাপার্টমেন্ট ষোলর সামনে তোমার চাঁদমুখটি দেখিয়ো প্লিজ। জানি তোমাদের সিস্টেমে কল করবার অপশন নেই তা স্বত্তেও এই আমার ফোন নাম্বার”।

লেখবার পর প্রথমটা সাঁটালাম পোস্ট বক্সটার মাথায়, ঠিক যেখানে আগেরদিন ফেইলড ডেলিভারি নোটটা লাগানো ছিল।  আরেকটা বাড়ির দরজায়।

ময়ূখ কিন্তু কিন্তু করে বলল দুটোই যথেষ্ট নয় কি?

ওর আর কি? বললেই হল?  বলা যায় না সে লোক ষোল নম্বর খুঁজে পেতে পথ হারিয়ে ফেললে? কম তো নয়? এ একেবারে স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে টং এ চড়তে হবে। তাই তিন নম্বরটায় দিকনিদের্শ সহকারে ওপরে আসবার  সপত্র আহ্বান।

তারপর অনন্ত অপেক্ষা। আর মাঝে মাঝেই অনলাইন ট্র্যাকিং এ চোখ রাখা।

অবশেষে ছ’টা বত্রিশ মিনিটে বাজলো বেল।

ময়ূখের সাংঘাতিক আক্ষেপ যে ছোটবেলা থেকে একটুও খেলাধুলো না করবার দরুণ আমি এত দুবলা পাতলা। দু পা দৌড়লেই বুকের লুবডাব পাশের বাড়ি থেকে শোনা যায়।

ইস! ও যদি  দেখতে পেত বেলটা বাজা মাত্রই আমার এই পরিত্রাহি ছুটটা।  উসেইন বোল্ট ও পলকে বোল্ড হয়ে যেতেন।

কিন্তু এমন ফাটা কপাল। চিরকাল দেখে আসছি আমার একটা অতুলনীয় কীর্তিও কখনো সাক্ষীসাবুদ রেখে উদ্ভাসিত হয়নি। এ যাত্রাও সেই সেম কেস।

মাথা ভর্তি খুদে বিনুনি দুলিয়ে হাসল লোকটা। “ এই নাও তোমার পার্সেল। আর ওই কাগজগুলো খুলে দিতে পার এবার, কি বল? অ্যানড ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তুমি কি সারাক্ষণই এরকম জুতো ছাড়া নিচে নেমে আসো? কি ভয়ংকর!’

এসব কথার কি উত্তর হয় কোনও?  ও কি আর পেনসিল পড়েছে যে জানবে এই মুহুর্তে কি মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমি?

ফোর টাকিলা ডাউন মুখে গদগদ চিত্তে ওপরে উঠে আসি।

এতদিনের লড়ালড়ি, অ্যাকাউন্টটা সেট আপ করতে কিন্তু পাঁচ মিনিটও লাগলো না।

ময়ূখের ফিরতে রাত হবে।

রাতের রান্নাটা সেরে ফেলা যাক অ্যাটলিস্ট।

কড়াইতে ডিমের ঝোল ফুটছে। হয়ে এসেছে প্রায়। নামানোর আগে সামান্য ঘি দিলেই হয়ে যাবে। প্রাণে ধরে বেশি ব্যবহার করতে পারি না। বাবার দেওয়া ঝর্না ঘি এর এটাই শেষ বোতল।

জানলার বাইরে আকাশ জুড়ে মেঘের চাদর, ভিজে হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে চারাগাছগুলো।

বীয়ারের ক্যানে চুমুক দিচ্ছি আর ভাবছি।  জীবন ব্যাপারটাই কি অদ্ভুত তাই না? বিদেশে আসতেই চাইনি কখনো। আজ ফেরবার কথা ভাবতে পারি না আর। ফিরতে চাইলেই কি ফেরা যায়?

অ্যাকাউন্টটায় টাকা আছে, আমার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কিন্তু চোখের পাতায় আজীবন “বাড়ি” বললেই যে জায়গাটা ভেসে উঠবে সেখানে যাওয়া যাবে না আর কোনোদিন।

মায়ের সাথে রেগুলার কথাবার্তা হলেও বাবার ছবিটার দিকে তাকাই না, তাকাতে পারি না বলাই ভাল।

আজ হঠাৎই একলা বারান্দায় আরও একলা আমার কানে কানে কে যেন বলে উঠল চিরপরিচিত গলায়

“চরৈবেতি। চরৈবেতি”।

চেষ্টাটা তো থামাইনি কিন্তু পারছি কোথায়- বাবা?

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: