এতো বড় রঙ্গ

(১)

“পেনসিলটা ডকেই উঠে গেছে মনে হচ্ছে। এই নিয়ে তিনবার ফিরে গেলাম। আর কিছু নয়, আপনার ধৈর্যর পরিমাণটা মনে হচ্ছে ওভার এস্টিমেট করে ফেলেছিলাম”——–

সক্কালবেলা এরকম একটি মহামূল্যবান মেল পেয়ে চোখগুলো ইচ্ছের বিরুদ্ধেই গোল হয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আনন্দে ময়ূরের মত পেখম তুলে নাচতে লাগল মনটা। আরেঃ পেনসিল পড়তে এসে কেউ তিনবার ফিরে গেছেন? এত পুলক রাখি কোথায়! ঠিক পড়ছি তো?

তার ওপর আবার  “আপনি?”

কলকাতার মুষ্টিমেয় বাস কনডাক্টর ছাড়া কেউ কি কক্ষনো আমাকে এমন সিরিয়াসলি নিয়েছে?

হাত পা ছোঁড়া শেষ করে দেখি আরও দুটো লাইন বাকি থেকে গেছে পড়া।  বাবারে। সে কি বাক্যবাণ! ছত্রে ছত্রে শুধু শ্লেষ আর কটাক্ষ!

পেনসিল কেন চুপ ছিল কটাদিন সেটা যদি বুঝতেন ভাই তাহলে সুদূর সাউথ আফ্রিকাতে বসেও আপনার আমার জন্য মারাত্মক দয়া হত।

শুনবেন?

কথায় বলে “আমি যাই বঙ্গে-কপাল যায় সঙ্গে”- বঙ্গ ছেড়েছি বহুদিন কিন্তু সে আমাকে ছাড়লে তো?

এক পশলা গভীর আলোচনা-সমালোচনার পর ঠিক হল,অনুষ্ঠানের নাম হবে বঙ্গোৎসব। মন্ট্রিয়ল ইন্ডিয়ান বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের বছরের প্রথম প্রোগ্রাম।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ১৭ ই মে কে সামনে রেখে শুরু হল প্ল্যান ছকা আর রিহার্সাল। একদিকে পুরো দমে “আজি শুভদিনে পিতার ভবনে” অন্যদিকে “খোকাবাবু যায়”। চমকে উঠলে চলবে না। এটার নাম কম্বো অফার, সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে কমপ্লিট প্যাকেজ করে বিক্রি করতে হবে। পাবলিক এখন এটাই চায়।

চাইতেই পারে। সেটাতে আমার কিচ্ছু বলবার থাকতেই পারে না। কিন্তু ময়ূখ আর সূর্যদা “গভীর জলের ফিশের” স্টেপ শুরু করলেই আমার ভেতরে যে কাঁপুনি চালু হত সেটা কি করে লুকোবো? জানি শনি-রবিতে লোকে সোম-মঙ্গলের চাইতে বেশি উদার থাকে কিন্তু যদি কমপ্লেন করে?  আর না করলেই বা কি?  এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সইতে না পেরে “ধরিত্রী দ্বিধা হও “ বলে কাঠের মেঝেটা কার্পেট মার্পেট শুদ্ধু হঠাৎ ভেঙ্গে পড়লে?

কাঁপুনি জোর করে থামিয়ে মুখে হাসি টেনে “কাণ্ডারি হুঁশিয়ার” হওয়ার চেষ্টা চালাতে কার্পণ্য করি না একটুও।

এই গানটাও হচ্ছিল কিনা।

অ্যাসোসিয়েশনের ট্রেজারার- বুঝলাম।

খুব ভাল নাচে- সেটাও মিথ্যে নয়।

তা বলে ওনাকে আবার রন্ধনবিদ্যারও  পরিচয় দিতে হবে?

কিলো কিলো বার বললাম “এত কিছুর পরে স্টলটা কি না দিলেই নয়?”

“ভাবছ কেন? আমি একা না তো? পার্টনার আছে না? ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে”- মুখের সে কনফিডেন্ট হাসির বাহার কি।

আইটেম?

কলকাতা স্টাইলড সুপার অথেনটিক এগ ডেভিল।

পার্টনার হচ্ছেন “-” দেবী, তিনি আবার ময়ূখদের কোরিয়োগ্রাফারও বটে।

দুদিন আগে দেখলাম চৌধুরী সাহেব আর “-” দেবীর জীবনসঙ্গী “-” দেব কিমা টিমা, ডজন ডজন ডিম আরও গুচ্ছ উপকরণ কিনে আনলেন।

বাড়িতে দুটোই ভিডিও চলে। অনবরত। অবিরত। হয় “ পাবলিক তার নাম রেখেছে খোকা চারশো বিশ” না হলে “ নিরঞ্জনের ডিমের ডেভিল”।

এরপরেও পেনসিলের নাম হৃদয়ের কোনও কর্নারে থাকা সম্ভব?

মাথা বনবন করে। বন্ধু-শত্রু তে কোনও পার্থক্য বুঝি না।

১৬ই মে রাত্তিরে ফাইনাল রিহার্সাল শেষ।

এবার ডেভিল প্রিপারেশন। তোমার হল শুরু আমার হল সারা। এদিকে সারাক্ষণ সোফায় শুয়ে হাক্লান্ত “-” দেব  হুকুম ছুঁড়তে থাকেন আমাকে।

“শোন না। চপগুলো ওরা দুজন বরং বানাক। তুই আমাকে একটু কোক খাওয়া দেখি”!

আর সঙ্গে সঙ্গে দাঁত খিঁচিয়ে উঠি আমি “লজ্জাও করে না! ভুঁড়িটা দেখেছিস? ওসব আজেবাজে জিনিস বাড়িতে রাখি না জানিস না”?

লজ্জা তো দূর কি বাত, মাথা ঝাঁকিয়ে লাফিয়ে ওঠে আমার বন্ধুও- “ সে তো বলবিই।  নিরামিষ কোক হল আজেবাজে জিনিস আর লোককে ডেকে ডেকে সাম্বুকা খাওয়ানোটা হচ্ছে সাংঘাতিক স্বাস্থ্যকর লক্ষ্মণ বল”?

অগত্যা কোকের সন্ধানে বেরোই দুজনে।

রাত বারোটা বেজে গেছে কখন। একটা রাকুন ছাড়া কেউ নেই রাস্তায়।

কি আর করব। খানিকটা পরনিন্দা পরচর্চা করে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন।

সেই আণ্ডাময় দুনিয়া।

এই তো জীবন। আহা!

 

চলবে

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. I am the rarest visitor, but I am really enjoying reading this!

    Like

  2. 3ta lekhari jobab nai.i really enjoyed

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: