কালো মেয়ের পায়ের তলায়

মেয়েটার সাথে প্রথম আলাপেই যেটা চোখে পড়বে সেটি হচ্ছে ওর ফ্যাশন সচেতনতা। দুমিনিট কথা বললেই বুঝবেন সাজুগুজু করতে এ বড়ই ভালবাসে। দেখতেও ভারি মিষ্টি তার ওপর। সম্পর্কটা হাই-হ্যালো পর্যায়েই ছিল এবং সেরকমই হয়তো থেকে যেত যদি না সেদিন ওই খেলাটা খেলতাম সবাই মিলে।

দেশের নাম ঠিক হয়ে যায় আগেই। তারপর ভাগ্যে যে শব্দটা পড়বে সেটা দিয়ে সেই দেশেরই অন্তর্গত একটা শহরের নাম বলতে হবে  খুব তাড়াতাড়ি। ভূগোলে আমার সীমাহীন বিদ্যার দরুণ খেলাটা বলতে নেই  আমার একটুও পছন্দ হচ্ছিলো না আর ভ্রূ কুঁচকে প্রচণ্ড কনসেনট্রেট  করবার অপচেষ্টাকে আর যাই হোক আমার অন্তত “খেলা” বলতে ইচ্ছে করে না।

মহা বিরক্ত হয়ে কখন এই আপদ বিদায় হবে ভাবছি আর একটু একটু করে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছি, যে যা বলছে মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।  ঠিক এই সময় একটা তর্কাতর্কি কানে এল।

“যাক বাবা ঝগড়াঝাঁটি মারামারি যা খুশি হোক,জাস্ট এই গেমটার কথা লোকে ভুলে যাক”- আশান্বিত হয়ে ইতিউতি তাকাতে থাকি।

“মোটেই ‘সি’ নয়, এখন ওটা ‘কে’। কলকাতা-কলকাতা”, মেয়েটা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে।

আর ‘সি বিশ্বাসীর’ দল ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওর ওপরে।

————————————————————————————-

“একটা কথা বলবে প্লিজ? এই শহরটার নাম তোমার হঠাৎ মনে এল কি করে”?- দুদিন পরে  একা পেয়ে  ওকে ফিসফিস শুধোই আমি।

কোঁকড়া চুলের রাশি  এক হাতে সামলাতে সামলাতে মধুর হাসে সে।

“কি বলছ? ভারতবর্ষ আমার স্বপ্নের দেশ জান? আমার তিন-তিনজন কাজিন আছে দিল্লীতে। টাকা জমাচ্ছি খুব। ওখানে আমাকে যেতেই হবে একদিন। তুমি কি লাকি!”, নির্নিমেষ চেয়ে থাকে মেয়েটা।

“কি দেখতে চাও তুমি আমার দেশের? হাজার হাজার বছরের ইতিহাস তোমাকে টানে? নাকি আমাদের অনন্ত বৈচিত্র?”

এক পলকের জন্যও চোখ সরায় না, গলার স্বরটা দু-তার নেমে যায় শুধু আরও।

“ওসব কিছু না। আমি তোমাদের মতো হতে চাই। এই ভারতীয় মেয়েদের মতো। তোমার চুলগুলো কি অপূর্ব তোমার কোনও ধারণা আছে? কিংবা তোমার নাকটা? আমাকেও যদি তোমাদের মতো দেখতে হতো”?

একটু সময় লেগেছিল ব্যাপারটা বুঝতে। এই মেয়ে “ইন্ডিয়া অবসেশনে” ভুগছে। আমার মধ্যেই ও তাবৎ  সেন- রাইদের দেখতে পাচ্ছে শুদ্ধু আমি ওই দেশটা থেকে এসেছি বলে। আমার জায়গায় ইনা-মিনা-ডিকা থাকলেও ওর একই রকম মনে হতো।

“আমার কাজিন আমাকে ওই লাল জিনিসটা এনে দিয়েছিল। বিন্ডি না কি যেন বলে? আমি স্কুলে সারাক্ষণ কপালে লাগিয়ে ঘুরতাম”।

এতক্ষণে আমার ভেতরের সদা জাগরূক “কাউনসিলার” টা আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হয়।

“শোন এরকম ভেবো না। এসব আবোল তাবোল কে ঢুকিয়েছে তোমার মাথায়? সার্জারি টার্জারি খুব খারাপ। আর সবচাইতে বড় কথা তোমায় কি সুন্দর দেখতে তুমি জানো? সেটার তো কদর করো”।

আলোচনাটা এত গম্ভীর হয়ে যাবে আন্দাজ করতে পারিনি আমরা কেউই।  বোঝা না বোঝার জমাট নৈশঃব্দ্যটা  অসহ্য বোধ হওয়ায় পলকা মন্তব্য করে বসে আরেকজন।

“কোনও ভারতীয় ছেলেকে ডেট করলেই তো পারো তুমি”।

কথাটা শেষও হয়নি, ঝটিতে বদলে গেলো এতক্ষণের আকুতি ভরা  লাইনার শোভিত আঁখিদ্বয়। যে বলেছে তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে আমার চোখে চোখ রাখে মেয়েটা। তারপর অদ্ভুত এক নিরাসক্ত সুরে জানায় “ ভারতীয় ছেলেরা আমায় ডেট করে না। ফ্লার্ট করবে কিন্তু ভালবাসবে না কখনো। আমায় কেন আমার মতো কোনও কালো মেয়েকেই বাসবে না। কেন বলতে পার?”

উত্তর ছিল না ওর কাছে। আমার কাছেও। বুঝতে পারছিলাম আমার ভেতরের সদা জাগরূক “কাউনসিলার” টা এত থতমত জীবনেও খায়নি।

থতমত ভাবটা কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে কিন্তু গলার কাছে যে দলা দলা ব্যথাটা আটকে আছে, সেটার যেতে সময় লাগবে বেশ বুঝতে পারছি।

 

 

Advertisements

3 Comments

Add yours →

  1. very touchy.tobe atai satto

    Like

  2. Didn’t know the forum rules allowed such brilnialt posts.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: