খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না

লিখতে তো আমি এমনিতে বেশ ভালইবাসি কিন্তু গোলমালটা হয়েছে অন্য জায়গায়। “অর্ডারি লেখা” লিখতে হবে ভাবলেই আমার মগজটা কিরকম যেন এলিয়ে পড়ে, হাত-পায়ের জোর চলে যায়, রাজ্যের ঘুম চোখ জুড়ে আসে, আর পুরনো, প্রায় হারিয়ে যাওয়া বহু বছরের পুষ্যি “করছি-করব” ব্যামোটা  মিচকি হেসে  জানান দেয় “এই তো আমি”।

একমাত্র ডেডলাইনের দাঁত খ্যাঁচানিতেই এই সিম্পটমগুলো একযোগে বিলীন হয়ে যায়।

এই কথাটাই ভেবে ভেবে কদিন থেকে খুব বিমর্ষ হয়ে পড়ছি। সারা পৃথিবীতে বদল নামক ওলট পালটের জয়গান আর আমার এই স্বভাবটা কি কিছুতেই যাবার নয়?

মায়ের বাণী “যার নয়ে হয় না, তার নব্বইতে হয় তো নাই আর হলেও বিশেষ লাভ নেই”।  প্রত্যেকবার ওয়র্ক এডুকেশন পরীক্ষার আগের সন্ধ্যেতে পপলিনের টুকরো কি কোনও পার্টিকুলার রঙের সুতোর সন্ধানে লক্ষ্মী ভান্ডারের উদ্দেশ্যে আমার ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড় দেখে দেখে ক্লান্ত বাবার স্ট্যান্ডার্ড বুলি “এরকম ইলেভেন্থ আওয়ার পাবলিক তুই হলি কি করে মা”। কিংবা এই বিভীষিকাময় পরীক্ষাটার সব যোগাড়যন্ত্র হয়ে যাবার পর রাত সাড়ে এগারোটার সময় হঠাৎ খেয়াল হওয়া “ আরে এত হয়রানিতে ব্রেন ডাউন হয়ে গেছে তো। হেরিং বোন স্টীচটা ডান দিক তোলে না বাঁ দিক থেকে?” আবার দৌড় পাশের বাড়ির জেঠিমার কাছে ; “এখুনি দেখিয়ে দাও। এখুনি”।

অত্যন্ত লজ্জিত আমি নিজের এই চারিত্রিক দুর্বলতায়। আরও খারাপ লাগে কারণ যার সাথে থাকি সে খুবই নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। ময়ূখের সাথে আলাপ হওয়ার আগে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতাম না কেউ পনের দিন বাকি থাকতেই অ্যাসাই্নমেন্ট কমপ্লিট করে ফেলতে পারে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝেছি ও একটু সিলেকটিভ এসব ক্ষেত্রে। ধরুন পড়ার টেবলে অ্যাশট্রেটা উপচোচ্ছে উপচোচ্ছে , কটমট তাকিয়ে আছি সেদিকে। কড়া গলায় জিগ্যেস করলাম “কি গো ওটা কবে ফেলা হবে”?

দ্বারা-পুত্র-পরিবার-তুমি কার কে তোমার মুখচ্ছবি নিয়ে নির্বিকার বসে থাকবে ময়ূখ। তারপর এক নিদারুণ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে “এই তো, ফেলব। ফেলে দেব”।

সে ক্ষণ আর আসে না। আসবে না।

পরের মুহূর্তে  আমি যখন ঝমঝমিয়ে খালি অ্যাশট্রেটা সামনে এনে রাখব, উটমুখো হয়ে  নৈর্ব্যক্তিক গলায় বলবে “ভগবান আমার কপালেই যে কেন এই গুন্ডা বউটা..”

কিন্তু আমাদের সবার ওপর যিনি টেক্কা দিতে পারেন এই ব্যাপারে তাঁর নাম আপনাদের জানা। শ্রীমতী চন্দ্রানী দেবীর কথা বলছি।  একটা উদাহরণেই জিনিসটা জলবৎ তরলং হয়ে যাবে।

আমার বড়পিসির পা ভেঙ্গে গেছে। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। ল্যান্ডলাইনে কল করলে ধরতে পারছেন না তাই অবশেষে এতকাল বাদে একটি মোবাইল ফোন নিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনিতে যথেষ্ট আধুনিকা হওয়া স্বত্তেও এই বস্তুটির সম্মন্ধে এক বিজাতীয় বিরাগ আছে পিসির। দুঃসংবাদটায় বিচলিত হয়ে রিঙ্কিকে ফোন নাম্বারটা পাঠাতে বললাম।

আমার বোন বললেন “এত চিন্তা করিস না। আমি কালই বড়পুসুর রান্নামাসির সঙ্গে কথা বলেছি, ওই ল্যান্ডলাইনেই। মোবাইল নাম্বারটা বাবার থেকে নিয়ে তোকে দিচ্ছি”।

সে ক্ষণ আর আসে না। আসবেও না জানি বলেই নিজে কাকুকে ফোন করে নিলাম।

শুনেছি আমার বিয়ের কার্ডগুলোতে আমার বোন কোনও এক স্পেশ্যাল জেল পেনে লিখবে মনঃস্থ করায় বাবা নাকি বলেছিলেন “ রিঙ্কু লিখবে যখন তার মানে বিয়ের পরেই কার্ড পাঠানো যাবে। আদৌ পাঠানো যাবে কিনা তাই বা কে জানে? যাক নিজে গিয়ে নেমন্তন্ন করবে বললে আরও মুশকিল হতো ”।

নাহ। বিচ্ছিরি নিন্দুকে হয়ে যাচ্ছি দিনদিন।

আমার জীবনে কি উলটোটাও দেখিনি? নিশ্চয়ই দেখেছি। এমন মানুষও আছেন কোনও কাজ ফেলে রাখলেই যাঁর অ্যালার্জি হয়, গায়ে র‍্যাশ বেরোয়।

আমার পরম পূজনীয়া শাশুড়িমাতার কথা বলছিলাম আর কি।

এই তো কিছুদিন আগে আমি বললাম “ ময়ূখের প্যান কার্ড ডিটেলসগুলো একটু পাঠাবে প্লিজ”। কলকাতার বাড়িতে কার্ডটা কোথায় রেখেছি সেটাও ভাল করে বুঝিয়ে দিলাম। উনি তখন একটা বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছিলেন। তিনদিন পরে ফিরবেন। বারবার জানালাম কোনও তাড়াহুড়ো নেই, ফিরে এসে জানালেই চলবে।

খুব ঘাড় নাড়লেন। সব বুঝেছেন।

পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই ফোন। “ এই নে ডিটেলস। কিন্তু তুই যেখানে বললি সেখানে খালি ফটোকপিগুলো আছে। ওরিজিন্যালটা নেই রে”।

এবার রামধমক লাগাই একটা “তুমি বিয়ে বাড়ি এনজয় করো। পরে খুঁজলেই হবে’খন”।উনিও উলটে আমাকে একটা রামধমক লাগাতেই পারতেন এই বলে যে “তোর আর কি,খুঁজতে তো হবে সেই আমাকেই”!

কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় এরকম তিনি কখনোই বলেন না!

এটা কিছুই নয়। আগের বছর দেশে গেছি। যেখানেই দেখা করতে যাচ্ছি বা যিনিই দেখা করতে আসছেন, হাতে আদরে মোড়া একটি প্যাকেট আর সেটাতে অবধারিত হয় শাড়ি কিংবা সালোয়ারের পিস।

রাতে ঝলক দেখে থ্যাঙ্ক ইউ বলে দিয়েছি কিন্তু সকালে উঠে হয়তো বললাম “ এইটা কিন্তু আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। চলো তো দিনের আলোতে আরেকবার দেখি”।

মা বললেন “ইয়ে মানে এখনি দেখবি? ওটা তো আর নেই”।

মানে সে শাড়ি এখন চলে গেছে, কদিন পরে পাটপাট অবস্থায় ফেরত আসবে ফলস- পিকো সমেত। ম্যাচিং ব্লাউজ যতক্ষণ না বানানো হচ্ছে , ওনার সে কি টেনশন!  হাওড়া থেকে লোক আনিয়ে তাঁকে বকুনি-মিষ্টি-শরবৎ দিয়ে সময়ে সবকটা ব্লাউজ না উদ্ধার করা অব্দি  চিত্তে শান্তি নেই।

 

কিন্তু এদিকে আমার কি হবে? এত বকবক করলাম কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই “তোমার দেখা নাই রে তোমার দেখা নাই”, মোটিভেশনের ছিটেফোঁটাও হৃদয়ে জাগ্রত হলনা। কিন্তু আর না। শিরে সংক্রান্তি এসে পড়েছে। এবার লেখাটা নিয়ে বসতেই হবে।

সেই “অর্ডারি লেখাটা”।

 

 

Advertisements

5 Comments

Add yours →

  1. amar akta nam ache janishto ‘darjeeling mail’.amar sasuri bolten.tor kintu humour gulo dine dine khub upobhog korchi.satti darun likhchis joto din jache.wish ai bhabe aro bhalo bhalo lekha tor pencil amader jano daya.

    Like

  2. ore lekha ta pore mone hoche jeno aainai nijeke dekhchi………..amar ma r o eki kotha sune amar 30 ta bochor periye gelo……..satyi amar noye hoi ni budhi……….90 teo hobe bole mone hoche na ……….tobe ami ar amar bor 2 jon i last moment e kori……….amader 2 jon r omil holo ami late kore anek somoi i bhul kori……..Kirtiman seta kore na…….tai amake awaz dewar sujog ta peye jai………eto sundar likhis tui……….ar porar por ja anando pai seta ke sabas, darun ei sob sabdo diye express korle kom kora hoi re………..:):)

    Liked by 1 person

  3. سلام از مدیریت سایت و همه دستاندرکاران اینسایت تشکر میکنم بابت همکاری و راهنمائی با علاقه مندان.میخواستم منو راهنمائی کنید تا بتونم مراحل اولیه رو از تکمیل فرم تا ارسال مدارک انجام بدم.از همراهیتون سپاسگذارم

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: