সর্দির বদ্যি

বিদঘুটে ঠাণ্ডা লেগেছে। রাতে ঘুম নেই, দিনে শান্তি নেই। মাথাটা হিমালয়ের মত ভারি, মনে হচ্ছে পাশে খুলে রাখলে ভাল হয়।

দিনে শান্তি নেই কারণ জেগে থাকলেই তুমুল ঝামেলা হচ্ছে। ময়ূখের বদ্ধমূল ধারণা এই সাংঘাতিক সর্দি মহোদয়কে আমি রীতিমতো নেমন্তন্ন করে ডেকে এনেছি। আর রিঙ্কির বক্তব্য “সাধ করে তুই কেন এরকম শরীর খারাপ করিস দিদিভাই?”

এটা একটা কথা হল? আরে গত সপ্তাহের আকাশটা যদি দেখতেন। জলভরা কালো মেঘরাশি দলে দলে বাইরে হাত নাড়ছে, কাচের জানলায় দেখত না দেখ ফোঁটা ফোঁটা টুপটাপ, কানের কাছে মিঠে হাওয়ার গুনগুন “এমন দিনে তারে বলা যায়”।

“এমন দিনে” কখনো ওই গদার মতো উইন্টার কোট গায়ে চড়ানো যায়? ফলশ্রুতি রাস্তায় লোকজনের বড় বড় চোখে চেয়ে থাকা, এক মুখ চেনা মহিলার সস্নেহ আর্তনাদ “হোয়াটস রং উইদ ইউ?” আর এই অসহ্য মাথার হাল।

কি করে বোঝাই অসময়ের এই বৃষ্টির ঝুমঝুমে নেশাটা রক্তসূত্রে অর্জিত, রেহাই পাবার কোনও  আশু সমাধান এখনো পর্যন্ত অধরা।

বুঝতেই পারছেন এসব “ ইউজলেস এক্সকিউজ” চৌধুরি সাহেবের পাথুরে সায়েন্টিস্ট হৃদয় গলাতে একেবারেই অসমর্থ।  তাঁকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায় না অবিশ্যি। কর্ণকুহরে বলা নেই কওয়া নেই ননস্টপ “অন্তর্জলি যাত্রার” ঘং ঘং  কাশির বেসুরো বাঁশি আর কাঁহাতক সহ্য হয়? টেবলে ডজন ডজন টিস্যু আমার নাকের জল ধরে রাখতে নাকাল।

তার ওপরে আমার যা রোগ,  গলা দিয়ে কিছুই নামছে না। খাব কি? কিছুর স্বাদ বুঝতে পারলে তো? আলুপোস্ত যে আলুপোস্ত যার জন্য  আমি যে কোনও লেভেলে স্যাক্রিফাইসে রাজি, এক অতি প্রিয় মানুষের হাতে তৈরি সেই অপূর্ব উপাদেয় বস্তুটিও যখন ফেল মেরে গেল বুঝলাম কেসটা এবার গুরুতর। যৎপরোনাস্তি  ভোগান্তি আছে কপালে। কিন্তু আমি অফুরন্ত আশাবাদী মানুষ, “টুমরো উইল বি আ বেটার ডে” তে সদা বিশ্বাসী। তাই পরম মমতায় বাকি আলুপোস্তটুকু তুলে রাখলাম বাটিতে।

এই করেই কেটে গেলো শনিবারটা। বিনিদ্র রজনী দৌড়ল রবিবার সকালের দিকে।

“তুমি কি সারা জন্মে একবারও গার্গল করোনি? আই মিন হোয়াটস সো বিগ ডিল অ্যাবাউট ইট? ড্রামাকুইন ছাড়া আর কি বলা যায় বলো”?

আপনমনে গজগজ করতে করতে আলু- ক্যাপসিকাম-ডিমের কুচি দেওয়া মুচমুচে ন্যুডলস নিয়ে আসে সে।

বিরসবদনে প্লেটটা সরিয়ে রাখতে রাখতে টের পেলাম এবার কিছু একটা করতেই হচ্ছে। গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করছে ভীষণ। চোখের পাতায় পুরনো বহু চেনা ছবি।

জ্বর হয়েছে। দোতলায় চুপ করে শুয়ে আছি। চোখ বন্ধ কিন্তু কান খাড়া। একটা চেনা পায়ের আওয়াজ শুনবে বলে। জানে আমার জ্বর, তবু সারাক্ষণ অফিস অফিস! বাবা যে কেন এমন?

অভিমানটা দানা বাঁধবার আগেই মাথায় এসে পড়ে হাতটা। লম্বা আঙুলগুলো বিলি কাটতে থাকে চুলের ভেতরে।

“রাতে কি খাবি বলতো মা? গরম তুলতুলে রসগোল্লা এনেছি। দেখ কি ভাল লাগবে”।

খটখটে শুকনো ঠোঁটে অজান্তেই জিভ চলে গেলো, রসগোল্লার রসটা যদি একটু হলেও লেগে থাকে? আজও?

বৃথা চেষ্টা করলাম দুপুরে একটু ঘুমনোর। বিশমনী মাথাটা চল্লিশমনী হওয়া ছাড়া কোনও কাজের কাজ হল না।

ময়ূখের কটমটে চাউনি, সহস্র উপরোধে আমি যা করতে অপারগ, সোমবারের চোখ রাঙ্গানি অনায়াসে করিয়ে নিল সেটা।

কখনো একলা করিনি আগে।

কতযুগ পর।

টগবগ করে জল ফুটছে। আতংকিত মুখে তাকিয়ে আছি সেদিকে।

পরের স্টেপটা ঠিক কি যেন ছিল?

লম্বা নিঃশ্বাস নিলাম একটা।

এইবার—

ফুটন্ত জলে দু চিমটি আয়ডেক্স দিয়ে টাওয়েলে মুখ ডুবিয়ে ভেপার নেওয়ার মোক্ষম মুহূর্তে চোখাচোখি হয়ে গেল ভদ্রমহিলার সঙ্গে।

ফটো থেকে নীরব সাহস ভেসে আসছে, “এই সামান্য কাজটা করতে তুই এত ভয় পাস কেন বলতো”? সারা জীবন কি মা সবকিছু করে দিতে পারে পাগল মেয়ে”। রাতে শোবার আগে আরেকবার নিস কিন্তু। তিনদিন ঘুমোতে পারিসনি”।

এখন আর নিজের হাতে করে দিতে পারেন না কিন্তু মা  বারেবারে এমন করেই চলে আসেন। ঠিক যখন দরকার তখন।

 

Advertisements

6 Comments

Add yours →

  1. Brishtir taan upekkha kora jaay, na uchit? 🙂
    Don’t worry, osudh khao-na-khao, sordi 7-dinei sere jabe!
    Cheer up!

    Liked by 1 person

    • Ei jonnyoi toh apnake amar eto pocchondo..:)

      Like

      • সত্যি, বৃষ্টির সঙ্গে আমার বহুদিনের সম্পর্ক, আলাদা টান! ছোটবেলায় গ্রামে ঝম্‌ঝমিয়ে বৃষ্টি এলেই, যাই পরে থাকি সেভাবেই ছুটে বেরিয়ে যেতাম। যতক্ষন খুশি ভিজতাম, মা চেঁচিয়ে ডাকত, “সর্দি লাগবে, আর ভিজিস্‌ না” কে কার কথা শোনে! একটা ঘটনা বলি, সেও অনেক বছর আগের কথা, আর্লি নাইন্‌টিজ, তখন আমরা সল্টলেক করুণাময়ী তে থাকি, মেয়ের বয়স দুই কি আড়াই। গরমের দূপুরে তেড়ে বৃষ্টি এলো, তখন আর বাবা-মেয়েকে কে আটকায়! মেয়েকে কোলে নিয়ে বৃষ্টিতে লাফালাফি করে ভিজ্‌তে লাগলাম… সে কি উত্তেজনা! ওদিকে মেয়ের মা আর পাশের বাড়ীর লোকজন হাঁই-হাঁই করে উঠলো, এইটুকু বাচ্চা কে কেউ এইভাবে বৃষ্টিতে ভেজায়, মাথা খারাপ, সর্দি লেগে যাবে, ইত্যাদি… কিন্তু তখন কে কার কথা শোনে। সেই কয়েকটা মিনিট ভেজা ওয়াজ সো এক্সাইটিং… 🙂

        Liked by 1 person

  2. khushi hoye gelam toh..:)

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: