বাংলার মানে বাংলার নামে

এই লেখার শুরুতেই স্ট্রং ডিসক্লেমারটা না দিলে জনগণ আমাকে কুটিকুটি কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলবে, সেটাতে অনেকের জ্বালা জুড়লেও আমি এক্ষুনি এক্ষুনি সেই সুযোগটি দিতে বিলকুল নারাজ।

তাই আগে ডিসক্লেমার, তারপর বাজে বকা।

বলি তাহলে? দেখুন খাঁটি সত্যিটা হচ্ছে আমি এক অতি নগন্যা নারী। বিদ্যাবুদ্ধি জ্ঞানকান্ড কোনোটাই বিশেষ সুবিধের নয়।  কিন্ত দারুণ ব্যাপারটা হল আমি প্রায়শই বহু অভুতপুর্ব গুণী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসবার সৌভাগ্য লাভ করে থাকি এবং আমার বুদ্ধিবৃত্তির ও একটু আধটু বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

এই আমার রুমমেটের কথাই ধরুন না কেন, রিসার্চের কাজ না করলে সারাক্ষণ কোনও না কোনও ডকুমেন্টারিতে বুঁদ। সেটা মিশরের ইতিহাস হতে পারে, সাপের সাতকাহন হতে পারে আবার জন্মান্তর রিলেটেড হওয়াও বিচিত্র নয়।

আর এক ক্যান্ডিক্রাশ ছাড়া বাকি সবকিছু নিয়েই আলোচনা চলতে থাকে দুজনের। জাস্ট একটা সেক্টারে আমার রুমমেট স্লাইট দুর্বল, কিন্তু সেটার কথায় একটু পরে আসছি।

ময়ূখ যেদিন প্রথম শুনল, আমার ঠাকুরদা কিরকম লেখক ছিলেন, সাংঘাতিক ইম্প্রেসড হয়ে গেছিল। তখন নতুন নতুন প্রেম,  বেসিক্যালি প্রেম কিনা সেটাও ভাল বুঝতে পারছি না এরকম একটা স্টেট, তাই সেখানেই না থেমে হুড়হুড় করে ইনফর্মেশনের ছটায় আলোকিত করে দিলাম চারিদিক।

“জানো তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র  আর দাদা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন”।

গম্ভীর মুখে মাথা নাড়তে থাকে ময়ূখ।

“তারাশঙ্কর? আই নো। পড়েছি তো”।

আর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি আমি।

বাহ! তারাশঙ্কর পড়েছে? অতদিন যদি টানতে পারি  মা-বাবা একে কখনোই রিজেক্ট করবেন না! আজকালকার সবাই মোটেই কিছু অত বাংলা মায়ের অ্যাংলো সন্তান হয় না। নিজের পছন্দে নিজেই অভিভূত হয়ে যাই।

আর ঠিক সেই মোমেন্টে কানের কাছে হাতুড়ির ঘা পড়ে একটা।

“পড়েছি তো। ধাত্রীদেবতা। টেক্সট ছিল কিনা। খুব কঠিন প্রশ্ন এসেছিলো বুঝলে”।

কোনোরকমে একটা ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করলাম “ইয়ে মানে ধাত্রীদেবতা ছাড়া আর কিছু পড়োনি”?

“আর কি পড়বো”? ভীষণ আশ্চর্য হয়ে চোখ তুলে তাকায় সে।

কিন্তু আমার সেটাতেও হার মানতে ইচ্ছে করলো না।

“যাগগে যাগ। তারাশঙ্করে হয়তো রস পায়নি, তাবলে কমন ম্যানস রাইটার? তাঁকে নিশ্চয়ই পড়েছে। লম্বা এক দম নিয়ে বুকে অসীম বল এনে বললাম “আর শরৎচন্দ্র? কিরকম লাগে তোমার”?

মহা পুলকে জ্বলজ্বল করে উঠলো মুখটা।

“বেটার। অভাগীর স্বর্গে মার্কস বেশি উঠত”।

এরপর কারো ধৈর্য থাকা সম্ভব?

“তুমি কি টেক্সট ছাড়া কিছুই বাংলা পড়োনি? কলকাতা ছেড়ে দিলাম, দেশের অন্যতম সেরা স্কুলে মাতৃভাষাটা কি একেবারেই ডকে তুলে দিয়েছিলে বাবা তোমরা?”

আমার অমন রুদ্র মূর্তি দেখে অনেকক্ষণ ফেলে রাখা দুধ-কর্নফ্লেক্সের মতো মিইয়ে গেল ছেলেটা।

“কেন করতাম তো। বাগধারা থাকতো কত। সেবার এসেছিল হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা জানো?”

“কি লিখলে তুমি?”- আমার রাগ পড়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।

“একটু মুশকিল হয়ে গেছিল বুঝলে। হাতের লক্ষ্মীর পরে একটা কমা ছিল তারপর পায়ে ঠেলা। আমি তাই হাতের লক্ষ্মী দিয়ে একটা বাক্য রচনা করে দিয়েছিলাম আর পায়ে ঠেলা দিয়ে আরেকটা!”

আপনারা ভাবছেন এটা শোনবার পরেও ওকে বিয়ে করবার সাহসটা পেলাম কোথায়?

এটা কিছুই নয়। পরে জানতে পেরেছিলাম “উত্তম-মধ্যম দুই ভাই খুব ভাল ফুটবল খেলে”  টাও সেই উর্বর মস্তিষ্কের ফসল।

আরেকবার খুব সিরিয়াসলি জানতে চেয়েছিল “হিমগহ্বর মানে এয়া্রকন্ডিশন্ড গোয়াল কিনা”।

আত্মহত্যা কি মার্ডার কোনোটাই করিনি দেখতেই পারছেন। কিন্তু ভেবেছি অনেক। ভাবতে ভাবতেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম ভদ্রলোকের সঙ্গে। পারলে ইনিই পারবেন। আর না হলে সন্ন্যাসিনী হয়ে আলাস্কা চলে যাবো।

প্রচুর ঝামেলার পরে বাবার লাইব্রেরীর মিনিস্য মিনি এডিশনটা  “সাড়ে তেইশ” কিলোতে ম্যানেজ করে মন্ট্রিয়ল নিয়ে আসবার সময় এই বইগুলো ছিল ফার্স্ট প্রায়োরিটি।

একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত যদিও কিন্তু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এঁর চাইতে শক্তিশালী কলম  অস্বাভাবিক বিরল। আমার মত অগণিত ক্লান্তিহীন মানুষ আছেন যারা একনিঃশ্বাসে পলক না ফেলে সারাজীবন অসংখ্যবার পড়েও আবার পড়বেন তাঁকে।

আর মন্ট্রিয়লের বাড়ির ছবিটা কমপ্লিটলি বদলে গেছে গত পাঁচ বছরে। কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব নেই সেটাতে।

বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বেলে বুকের নিচে বালিশ নিয়ে মগ্ন ময়ূখ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়েরই আরেক সৃষ্টি।

মগ্নমৈনাকের পরে।

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: