এটাই আমি

“স্নব”!

“স্নুটি”!

“অহংকারী”!

“কি যে ভাবে নিজেকে”!

উপরোক্ত প্রতিটি বিশেষণে কোথায়ও না কোথায়ও কোনও না কোনও ভাবে ভূষিত হয়েছি আমি, ভবিষ্যতেও হব জানি। এটা নিয়ে কোনও খেদ তো আমার নেইই উল্টে আজকাল বেশ এনজয় করি খেতাবগুলো।

“আরে ওগুলো সব এখন বাসি, সেদিন —- বলে কিনা তোর মত অ্যাম্বিশাস ও নাকি দেখা যায় না”- খুব পুরনো এবং সত্যিকারের এক বন্ধু  দেখলাম তখনো বেশ শকড!

এইটা শুনে কিন্তু নড়েচড়ে বসলাম আমি।

“—-” একটা নিদারুণ খাঁটি কথা বলেছে তো!

আমি যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এতে আমার বন্ধুর সন্দেহ থাকলেও, আমার একেবারেই নেই। আমার বাড়ির জনগণেরও কস্মিনকালে ছিল না।

থাকবে কি করে? সেই পর্বতসমান উচ্চাকাঙ্খার বিকাশ কি আজকে?  মনে হচ্ছে যেন তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে যুগান্তরের কাহিনী।

আমাদের বাড়িতে বাসন মাজা-ঘর ঝাঁট দিত ষোল-সতেরোর রেখাদি। চেয়ে  চেয়ে  ওকে দেখতাম আর হিংসায় পুরো ক্যাটক্যাটে সবুজ হয়ে যেতাম আমি। এই না হলে একটা কর্মবীরের  জীবন? এই না হলে একটা করবার মত কাজ?

আমি তো এগুলোই করতে চাই।

কিন্তু চাইলেই বা দিচ্ছে কে?

“জল ঘাঁটবে না কিন্তু”- মায়ের কড়া বারণ।

আর সে শাসন ডিঙ্গনোর সাধ্যি শেষদিন অব্দি হয়নি আমার।

কিন্তু ওই যে উচ্চাকাঙ্খা? তার পথ রূদ্ধ করা কি অতই সোজা?

তাই তক্কে তক্কে থাকা।

রেখাদি সব বাসন মেজে ধুয়ে মুছে সমাপ্ত করল আর আমার কাজ শুরু হল।

সেই সব বাসনগুলোকে টেনে টেনে ঠাম্মার বিছানায় নিয়ে যাও রে, ঠাম্মার সেলাই বাক্স হাতড়ে পরিষ্কার ঝকঝকে ন্যাকড়া বার করো রে, তারপর বালিশের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে আমি “রেখা” আর ঠাম্মা “মাসিমা”।

ও, আরেকটা শর্ত ছিল।

ঠাম্মাকে ওই সময়টুকুর জন্য অ্যাট লিস্ট আমাকে “তুই” বলে ডাকতে হবে- তাই না খেলাটার নাম “ রেখা রেখা তুই তুই”?

পরের অ্যাম্বিশানটা আরও মারাত্মক।

রান্নাঘরে মায়ের একটা মশলার বাক্স ছিল। সেই বাক্সটার ভেতরে নানারকম কৌটো। তার কোনোটায় জিরে গুঁড়ো তো কোনোটায় ধনে গুঁড়ো।

মা কোনও বিকেলে আমাকে একা রেখে বেরোলেই ঠাম্মাকে ডিরেক্ট ব্ল্যাকমেল করা চালু হত।

ওই দুরন্ত বাক্সটা হাতে না পেলেই কিন্তু উথালি পাথালি মন খারাপ করবে আমার মায়ের জন্য। আর নাতনীর মন খারাপ  হলে ঠাম্মা-দিদারা কিনা করতে পারেন?

মায়ের অনুযোগ-অনুরোধ-বকুনি সত্ত্বেও ওটা ঠিক হাতে চলে আসত আমার।

আহ! তারপর জিরে গুঁড়োর সাথে লঙ্কা গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়োর সাথে পাঁচফোড়ন  এলঢেল করবার  সে যে কি স্বর্গীয় আনন্দ!

এরকম করতে করতেই একদিন মায়ের মত চমৎকার রান্না শিখে যাব এটা ছিল আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

হায় রে দুরাশা!

পাটালী গুড় বিক্রি প্রফেশনটাও কিছুদিনের জন্য নেহাত মন্দ লাগেনি । কিন্তু “র-ড়” কোনোটাতেই বিশেষ সুবিধা করতে পারতাম না বলে “পাটালী গুল” ফেরি করবার বাসনাটা  মোটের ওপর ক্ষণস্থায়ী ছিল।

কিন্তু একটু আধটু বকুনি আর ভীষণ হাসাহাসি করা ছাড়া এই অ্যাম্বিশানগুলো  সেরকম একটা ভোগায়নি আমাকে যেটা হয়েছিল চতুর্থটির বেলায়।

পাওয়ার কাট হলে হ্যারিকেনের ভেতরে যে আলো জ্বলে সেটাতে হাত দিলে ঠিক কিরকম লাগে জানবার মর্মান্তিক ইচ্ছে হয়েছিল সেবার।

পুড়ে যাবার দগদগে যন্ত্রণাটা ফিরে ফিরে আসে আজও।

তাই তো বলছিলাম উচ্চাকাঙ্খা সংক্রান্ত এই গালাগালিটি যিনিই দিয়ে থাকুন তিনি মোটেই তেমন কিছু সাংঘাতিক বাড়াবাড়ি করেননি। । মা-বাবা থাকলে এই সমালোচকটিকে ডেকে মহা সমাদরে অ্যাপ্যায়িত করতেন এ আমি দিব্যচক্ষু দিয়ে দেখতে পাচ্ছি।

আর নতুন বছরের ছোঁয়া বলেই বোধহয় ওই দুটো মানুষকে বিচ্ছিরি রকমের মনে পড়ছে।

শুভ ১৪২২।

 

 

 

 

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. শুভ নববর্ষ।
    উচ্চাকাঙ্খা “রেখা রেখা তুই তুই” খেলা এখন খেলতে তো কোন বাধা নেই! 🙂
    অভ্যাসবশতঃ এখানেই কমেন্ট করে বসলাম।

    Like

  2. darun,darun hoiche.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: