আশি টাকায়

এই যে একটা করে দিন চলে যাচ্ছে আর একটু একটু করে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তার সব চাইতে জোরালো প্রমাণটা মেলে যখন দেখ তো না দেখ মনটা উল্টো দিকে দৌড় মারে, ফেলে আসা সময়টা কে পলক ছুঁয়ে দেখবে বলে।

সেদিন বাড়ি ফিরছি হঠাৎই চোখ চলে গেল মেট্রো স্টেশনের পাশে চুপটি করে বসে থাকা বিষণ্ণ লাল স্ট্রাকচারটার দিকে। সত্যি কত জন্ম  হয়ে গেল ওর দরকার ফুরিয়েছে। চিঠি কি আদৌ কেউ আজকাল আর লেখে কাউকে?

কোথায় টানটান ব্যোমকেশ কাহিনীতে বৃন্দা দূতির কাজ করা গর্জাস লেটার বক্স আর কোথায় এই সাদা বরফ মোড়া রাস্তায় একলা বোকা স্রেফ একটা বিবর্ণ ধূসর বাক্স বনে থাকা-  মহাকালের কি লীলা।

এইসব আবোল তাবোল মহান ভাবনা সাধারণত আমি নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখি আর ভাবপাত্র একেবারে উথলে উঠলে পেনসিলে র‍্যান্ডমলি বিতরণ করে কনজারভেশন অফ থটস প্রসেসটা ম্যানেজেবল পর্যায়ে নিয়ে আসি।

যুগ যুগান্তর আগে আমার বয়স ছিল পাঁচ কিংবা আরো কম। আর সেই তখনি এই লেটার বক্স নিয়ে একটা সাংঘাতিক  ব্যথা ভরা না পাওয়ার গল্প প্রস্ফুটিত হয়েছিল আমার জীবনে।

কিছু কিছু সিদ্ধান্তের রেশ থেকে যায় অ্যালঝাইমার হওয়ার প্রাক মুহূর্ত পর্যন্ত। আমি যেমন আজো বুঝতে পারি না সেদিন ঠিক করেছিলাম  কি ভুল। ছোটোকাকুর কথা শোনাটাই ঠিক ছিল নাকি নিজের ডিসিশনে অচল থাকলেই ভাল হত?

এই মর্মান্তিক দোলাচলের সৃষ্টি  যেদিন দিদা ফিরে এলেন পুরী থেকে।  এত এত গজা আর খেলনার সঙ্গে ছিল আরও দুটো জিনিস।

একটা টুকটুকে লেটার বক্স আর একই রকম লালিমায় লালিত একটি আলমারি। দুটোই পিগি বাক্স। বাড়তির মধ্য আলমারির হলুদ হ্যান্ডেলটা আমার মুগ্ধ চোখের সামনে যেন থেকে থেকে জ্যোতি বিকিরণ করতে লাগলো।

“একটা বাবির আর একটা তোমার”- বললেন দিদা।

বাবি আমার বড়মামার ছেলে।

এই অব্দি সব চমৎকার চলছিল। কিন্তু এরপরেই দিদা বাধালেন গণ্ডগোলটা।

“লেডীজ ফার্স্ট। তুমি কোনটা নেবে বল। অন্যটা বাবির”।

অনেকে থাকে না এমনিতে অত্যন্ত স্থিরমতির কিন্তু যেই অপশন দিলেন ব্যাস লাইফের বারোটা বেজে গেলো? ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য হলেন অ্যাবসল্যুটলি সেই গোত্রের প্রাণী।

ঘড়ি থেকে ঘোড়া, চয়েস দিয়েছেন কি তিনি গেছেন।

গম্ভীর মুখে ডান হাতে লেটার বক্স, বাঁ হাতে আলমারি, ডান হাতে আলমারি, বাঁ হাতে লেটার বক্স ক্রমান্বয়ে চালাচালি করে যারপরনাই মুষড়ে পড়লাম আমি।

ছিটেফোঁটাও সুরাহা মিলছে না যখন, এগিয়ে এলেন মুশকিল আসান ছোটোকাকু।

ষড়যন্ত্রকারীর মত কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসে গলায় বললেন কাকু “আলমারিটাই বেস্ট বুঝলি। আশি টাকা তো অনেক টাকা রে। সাবধানে রাখতে হবে খুব”।

“অ-নে-ক-ক-ক-ক টাকা?”- আরও গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“হুম”- কাকুর সংক্ষিপ্ত উত্তর।

এই আশি টাকার ব্যাপারটা আসলে আমার জীবনের ভীষণ গোপনীয় একটা অধ্যায়।

আগেই বলেছি চাকদাতে ছিল  দিদার বাড়ি। মায়ের সাথে লোকাল ট্রেনে ঝুমঝুম করে সেখানে আমার নিত্য যাতায়াত। জানলা দিয়ে মুণ্ডু  বাড়িয়ে বানান করে করে স্টেশনের নামগুলো পড়বার চেষ্টা চালিয়ে যেতাম । কোনও যুক্তাক্ষর ছিল না বলেই সম্ভবত মদনপুর নামটা একবার ভয়ংকর পছন্দ হয়ে গেল আমার।

আর কি? তক্ষুনি ঠিক করে ফেললাম এখানেই হবে আমার শ্বশুরবাড়ি।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মাকে জানিয়ে দিলাম সঙ্গে সঙ্গে।

ঠোঁট টিপে হেসে মা বললেন “ বেশ তো। কিন্তু বিয়ে করতে কত টাকা লাগে  জানিস? কোথায় পাবি তুই এত টাকা”?

তদ্দণ্ডেই ডিসাইড করা হল “ আশি টাকা ইজ ইনাফ”।

বহুদিন পর্যন্ত আমাদের বাড়ির আনাচকানাচ থেকে ঝাঁটপাটের সাথে লম্বা লম্বা লিস্ট বেরোতো। অসীম ধৈর্য সহকারে নিজের পেটের ওপর আমাকে বসিয়ে ওগুলো বানাতেন কাকু। তত্ত্ব-ফ্রিজ-বই-জামা-খেলনা সব ওই আশি টাকায়।

দিব্যি ছিলাম কিন্তু। বিয়ে করবার সেই তীব্র বাসনাটা কবে যে এমন আনসেরিমনিয়াসলি বিদায় নিল কে জানে। আর এখন তো——

সে যাই হোক। হৃদয় থেকে সর্ব খুঁতখুঁত বিসর্জন দিয়ে অবশেষে আলমারিটা উঠিয়ে নিলাম আমি। আর ওমনি হইহই করে দৃশ্যে আবির্ভাব হল বাবির।

“ কি দারুণ! কি দারুণ। এই লেটার বক্সটা! বুদ্ধু মেয়ে! এটা তুই আমায় দিয়ে দিলি! আমি তো এটাই চেয়েছিলাম”!

ওহ!  কি দুঃসহ মনোবেদনা আজো বয়ে চলেছি সে যদি জানতেন!

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

5 Comments

Add yours →

  1. ha ha ha.darun hoiche .specially last lineta.aro chai amon.goahead.god bless you.

    Like

  2. বাঃ, দারুন হয়েছে। বেশি অপশন দিলে সব মানুষই কনফিউস্‌ড হয়ে যায়, কারন কোন্‌টা বেস্ট সেই ইভ্যালুয়েশান করে ডিসিশান নেওয়া বড় ঝামেলার! বেস্ট অপশন হ’লোঃ কোন অপশন না দেওয়া – “এটা তোমার” বলে দিয়ে দেওয়া! 😉 তবে ৮০ টাকায় বিয়ের লিস্ট বেশ ইন্টারেস্টিং!

    btw: দেখলাম এই লেখাগুলোর লিঙ্ক তোমার FBookএও পাওয়া যাচ্ছে, সেটা একটা বিরাট ব্যাপার, জনগনের পক্ষে ওখানে ইন্টার‍্যাক্ট করা সহজ। এই সাইটে এসে কমেন্ট করতে গেলে বেশ কাঠ-খড় পোড়াতে হয়, আলাদা লগ-ইন করতে হয়… তবে ওখানে গিয়ে লিখতে গেলে আবার… 🙂

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: