এক যে ছিল কন্যা

আমার একটা ছোটো বোন আছে। আমরা একই বাড়িতে জন্মেছি, কৈশোর-তরুণবেলা কাটিয়েছি  আর তারপরে এই ১২০০০ কিলোমিটার দূরত্বটাকেও দিব্যি মানিয়ে গুনিয়ে আছি।   কিন্তু সেই মেয়েটার কথা আমি বিশেষ লিখি টিখি না।

এক তো সারাক্ষণই ভীষণ মন খারাপ করে আর দ্বিতীয় কারণটা আরও জব্বর।

সে মেয়ের যে আদৌ কোনও সোশ্যাল মিডিয়া প্রেজেন্স আছে সেটা বাইরে থেকে ছিটেফোঁটাও বোঝবার উপায় নেই, না ফটো আপলোড করে, না তো কিছু শেয়ার করে, সবচাইতে প্যাথেটিক জন্মে কারুর ওয়ালে কিসস্যু লাইক টাইকও করবার নামগন্ধ নেই।

কিন্তু একবার চ্যাট উইন্ডোতে টুকুস করে টোকা মারুন “কিরে আছিস নাকি?”

তক্ষুনি উত্তর ভেসে আসবে “হ্যাঁ। বল”।

এরকম পাবলিককে নিয়ে কিছু লেখা হেব্বি ঝামেলার।  মেঘের আড়াল থেকে সব গুছিয়ে পড়বে আর চোখা চোখা বাক্যবাণ ছুঁড়বে।  মুড ভাল থাকলে বলবে “মু-আহ”! আর পছন্দ না হলে বলবে “ গুপি বাঘার রাজকন্যা কম পড়িয়াছিল, তোর কি সাবজেক্ট কম পড়িয়াছে?”

যা দিনকাল, স্যু ট্যু করে দেয় যদি তাই ভয়ে ভয়ে থাকি।

এই গল্পটা বলবার আগে আরও একখান একটা কথা আছে।  আমার মা  ছিলেন এই মেয়েটার জেঠিমা অর্থাৎ কিনা জেনি। কথায় বলে না মনুষ্য চরিত্রের মত বিস্ময়জনক কিছু আর নেই, আমার দেখা এই জেনি তার বৃহত্তম প্রমাণ।

যে মা কে আমি লেডি হিটলার বলে জেনে এসেছি, সমগ্র পৃথিবী মাথা নত করে “ওরে বাপরে” বলে কুর্নিশ করে এসেছে, সেই ভদ্রমহিলাই তাঁর আদরের বুড়ির ব্যাপারে অ্যাবসল্যুটলি ইললজিকাল ছিলেন বুড়ির জন্ম থেকে নিজের শেষ মুহূর্ত অব্দি।

বুড়ি যদি বলে “জেনি আমি স্পষ্ট দেখলাম সূর্যটা আজ একটু পশ্চিম ঘেঁসে উঠেছে, মা সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় হেলিয়ে বলবেন  “হতে পারে, হতেই পারে”।

মা-বাবা-দিদিভাই কাউকেই সাংঘাতিক কিছু দরকার পড়তো না এই বুড়ির, জেনি যেখানে সেও সেখানে।

মানে এরকমই হয়ে এসেছে সারা জীবন। এই লেডী ধৃতরাষ্ট্ররুপীনি জেনি আর তার বুড়ির দৌলতে বলাবাহুল্য আমরা বাড়ির বাকি জনতা খুবই কোণঠাসা এবং কুণ্ঠিত অবস্থায় থাকতাম। মাঝে মাঝে খুব অসহ্য লাগলে আমার কাকিমা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বিদ্যাসাগরের রেফারেন্স টেনে বলতেন “ এত আদর দিয়ো না দিদি। এ মেয়ে একদিন না তোমার ভুবনের মাসির দশা করে। সে পোটেনশিয়াল এর আছে”।

সব কিছুর ওপর আবার জেঠুও কম যেতেন না লাই দিতে।

সে যাই হোক ইন্দ্রাণীর বোন চন্দ্রানীর চাঁদের কলার মত বদমাইশিতে বিকশিত হতে হতে যথাকালে স্কুলে যাবার সময় হল। আর স্কুলে ভর্তি মানেই ক্ষুধা-নিদ্রাহরণকারী বিভীষিকাময় অ্যাডমিশন টেস্ট।

“দিকে দিকে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে”- সকালে উঠেই জেনি এবং জেনির অধিনস্ত সমস্ত কম্যান্ডারেরা ফর্ম তুলতে কলকাতা পরিভ্রমণে বেড়িয়ে পড়লেন।

সে এক হই হই রই রই ব্যাপার। একমাত্র কাকিমা আবার একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন “ ওই ফর্ম তোলাই সার। ও কি পড়াশুনো কিছু জানে? ও কি কোনোদিন কোথায়ও চান্স পাবে বলে তুমি মনে করছ দিদি? ধন্য তোমার আশা”।

আমার প্রবল পরাক্রান্তা মা আরও প্রবল প্রতিবাদ করতে গিয়েও হঠাৎ কিরকম মিইয়ে গেলেন, হয়তো অন্য কিছু মনে পড়ে গেল তাঁর।

তার কদিন আগেই যখন দুনিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে মা রিঙ্কিকে পড়াতে বসিয়েছিলেন। এক সন্ধ্যেয় রেন রেন গো অ্যাওয়ে শুধু মাকেই নাকের জলে চোখের জলে করে দেয়নি, আমাদের পাড়ার বজ্জাত হুলোটা পরের তিনমাস নিঝুম দুপুরে আপন মনে “লিটল জনি ওয়াণ্টস টু প্লে” বিড়বিড় করত এ আমার নিজের কানে শোনা। শুধু যার মুখস্থ করবার কথা সে নির্বিকার চিত্তে দিদিভাইয়ের সাথে রুটি আলুভাজা খাবার বায়নায় মত্ত।

শুকনো লঙ্কাওয়ালা কড়কড়ে আলুভাজা খাওয়াটা কে তিনি কোনও অজ্ঞাত কারণে বড় হয়ে যাওয়ার মস্ত সিম্বল বলে মনে করতেন, বস্তুটা দিদিভাইয়ের অতীব প্রিয় ছিল বলেই মোস্ট প্রবাবলি।

শেষ পর্যন্ত এক জরুরি বৈঠকে বাবা রায় দিলেন, ছুটির দিনে রিঙ্কির পড়াশোনার অগ্রগতি বাবা দেখবেন আর সোম থেকে শনি ৭ টা থেকে ৯-৩০ ওই তিন বছরের পুঁচকি  কাকিমার কব্জায় থাকবে। এ বংশের মেয়ে একেবারে ক অক্ষর গোমাংস হবে সেটা কমপ্লিটলি আনঅ্যাকসেপটিব্ল।

“তুমি কিন্তু ধৈর্য হারাবে না চিনু। আমি পাশের ঘরেই থাকব”- বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা জেনি আল্টিমেটাম দিলেন।

শ্রীকান্তের দাদার “পাশের পড়া” মনে আছে? এ কেসটা তার চাইতেও গোলমেলে।

এক রাত্তিরে আমার হোম টাস্ক শেষ। বিদ্যেবতী তখনও কি যেন বিনবিন করে যাচ্ছে।  পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে দেখি সে এক আজব দৃশ্য।

সারাদিন কাজের পরে কন্যাকে পড়ানোর প্রাণান্তকর পরিশ্রমে ঘুমিয়ে পড়েছেন কাকিমা কিন্তু তাও ছুটি মেলেনি বিচ্ছুটার।

জলভরা চোখে  টিউব লাইটটার দিকে তাকিয়ে একমনে বলে চলেছে সে “ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম পামুলাপতি ভেঙ্কট নরসিমা ম্যাঁও”!

এই ঘটনার পজিটিভ রেজাল্টটা দেখলেন?

ইহজীবনে আমি  নরসিমা রাওয়ের আস্ত নামটা ভুলব না।

এইটুকু পড়ে আপনাদের মনে যদি কিছুমাত্র সন্দেহের উদয় হয়, সেফ সাইডে থাকবার জন্য  এই আরেকটা লাইন জুড়ে দিচ্ছি-  আমাদের বাড়ির ছোট কন্যের এম বি এ কলেজটিও সিলেক্ট  করে দিয়েছিলেন তাঁর জেনি আর ফর্ম ফিলাপের মত এলেবেলে কাজগুলো তিনি দিদিভাই এর মত অকিঞ্চিৎকর প্রাণীকে  দিয়েই করিয়েছিলেন।

 

 

 

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. এই ক’দিন একটু, কিম্বা বলা যায়, বেশ বেশি রকমের-ই, ক্যাওসের মধ্যে আছি। জীবনে মাঝে-মাঝে এমন হয় না? একসঙ্গে চারিদিক
    থেকে টান আসে, এ বলে আমাকে দ্যাখ, তো ও বলে আমাকে দ্যাখ, তখন শ্যাম-রাখি-না-সখি-রাখি করতে গিয়ে প্রাণান্ত, আর তার
    মধ্যে যদি নিজেকেই ২৪ ঘন্টা ER-এ থাকতে হয়, তাহলে তো সোনায়-সোহাগা! নাঃ, আপাততঃ এযাত্রা ফল্‌স এলার্ম ছিল, তবে ধকল
    তো অনেক, তার জের এখনো চলছে, আস্তে-আস্তে চাঙ্গা হচ্ছি, কিন্তু শান্তিতে ঘরে বসে থাকার উপায় আছে? এই তিনদিন ইউনিভার্সিটি
    যেতে পারিনি, ছাত্ররা ইমেল-বান ছুঁড়ে একেবারে ঘায়েল করে দিচ্ছে!
    সে যাক্‌গে, ইতিমধ্যে তোমার দু’টো লেখা জমেছে, পড়ার ফুরসৎ পাইনি। এখন পড়লাম। “ম্যান্‌স ব্রেন” নিয়ে ম্যান্‌স সাইড থেকে কিছু
    কথা বলতে পারতাম, বহু বছরের অভিজ্ঞতা তো, তবে সে এখন অবান্তর! “এক যে ছিল কন্যা”র কাহিনী ও বেশ লাগলো। পিভি শুনলে
    আমার প্রথমেই পলি-ভিনাইল মনে আসে, নরসিমহা “ম্যাও” এর পিভি-টা আমারও এবার জানা হয়ে গেল। 🙂

    কিপ ইট আপ! অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

    Like

    • “are you fine?”..The thought never really left me in last few days.. looks like somewhere deep down I was right..I am very worried now..
      all I want to say is.. please take care.. please..
      student can wait.. everything else can wait..
      health comes first.. rest will fall into place..
      I will wait to hear from you only one thing next.. that you are recovering faster..
      and last but not the least.. I will consider myself truly fortunate if I get to hear your account on “man’s brain”..anytime..:)

      Like

      • i am alright, thanks for your concerns. actually, my situation is somewhat like “ঘর-পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়!” but considering the event through which i have gone seven years back (i am now in my second life), it’s sort of legitimate for me to get scared and rush to ER even when it’s a false-alarm! anyway, life is like this! 🙂

        and yes, someday i will share my two-cents on “man’s brain” but for now, i have to borrow a phrase from Dipak-da, who often says, “সে গল্প আর একদিন হবে”! good night.

        Like

  2. Do take care..:)

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: