দৃশ্য ৫- রবি তীর্থে

স্থান-   শ্যামবাজার পাঁচমাথার জমজমাট মোড়

কাল-  বর্তমান কাহিনিতে বিশেষ জরুরি নয়।

অনেকদিন পরপর দেশে ফিরলে খুব অদ্ভুত একটা ফিলিং হয় প্রথম কয়েকদিন, তারপরেই আবার সব ঠিক হয়ে যায়। এবার  জেট ল্যাগের ঘোরটা ঠিক কাটেনি তখনও আমার।

“সামবাজার- টালা- চিড়িয়ামোড় –সিঁথি- টবিন রোড”- সিগন্যালে আটকে পড়া বাসগুলো থেকে ভেসে আসা ননস্টপ চেঁচানিতে  কি যে নস্টালজিক লাগছিল, মনে হচ্ছিল এখুনি স্কার্ট- ব্লাউসে বিনুনি দোলানো মেয়েটাকে দেখতে পাব বুঝি। কলকল করে বন্ধুদের সাথে বকতে বকতে ওই তো চলেছে।

লাল আলো সবুজ হল যেই হঠাৎ শুনতে পেলাম কোথায় যেন তারস্বরে বাজছে “ যে ছিল আমার স্বপনচারিনী”।

এক মুহূর্তের জন্য একটু হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিয়েছি প্রায় তক্ষুনি। এটা তো জানতামই। এমনটাই তো হবার ছিল বাবা।

এরপর স্বপ্নের রেশ কাটতে না কাটতে খানিকটা ধাতস্থ হতে না হতেই শুনি পাইকপাড়া গর্জে  উঠেছে “ বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান”।

ততোক্ষণে আমার মাথাটাও কিরকম যেন একটু একটু ঘুরতে শুরু করেছে আমি বেশ বুঝতে পারছি। কয়েক ঢোঁক জল খেলাম তাও গলা শুকিয়ে কাঠ।

টবিন রোডে নামতেই মনে হল কেন কবি বলে গেছেন শেষের সেদিন ভয়ংকর। ঘিলু গলে যাওয়া গরমে  ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পে তারস্বরে “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে” চলছে ভাবা যায়?

বাড়ির কাছেই দুর্গা ভাণ্ডারের মালিক আজন্ম পরিচিত কাকু আমার বিরস বদনে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হাতে একটা ক্যাডবেরি ফাইভ স্টারের প্যাকেট ধরিয়ে দিতে দিতে বললেন “এটা এখনো আগের মতই ভালবাসিস তো?” তারপর একটু থেমে, ফিচেল হাসির সাথে যোগ করলেন  “নাকি বিদেশি চকোলেট ছাড়া এখন আর কিছু মুখে রোচে না?”

কুচ করে ফাইভ স্টারে নাতিবৃহৎ  একটি কামড় দিয়ে কাউন্টারে পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম “ এর মধ্য মাথা ঠান্ডা করে এত কাজ সামলাও কি করে? এই হিসেব নিকেশ? কান ঝালাপালা হয়ে যায় না তোমাদের”?

বিগলিত হাস্যে চারপাশ উদ্ভাসিত করে জবাব দিলেন কাকু “ কি যে বলিস। এটা তো কিছুই নয় রে। তোর কপাল ভাল এখন কোনও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা হচ্ছে না। আজকাল সবাই ঠাকুরের গান গায়। ওটাই লেটেস্ট ট্রেন্ড বুঝলি”।

একটা লম্বা পজ। তারপর মারাত্মক ধীরে প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বললেন “ বড়দা তো চিরকালের শান্ত মানুষ, তাও শেষের দিকে ধৈর্য হারিয়ে ফেলতেন জানিস”।

আমার বাবা ছিলেন পাড়ার বড়দা।

“আর আজ আরেকজন থাকলে যে কি হত”! বলতে বলতেই শিউরে উঠলেন কাকু।

আমি সম্পূর্ণ সহমত হয়ে মাথা দোলাতে থাকি।

সিরিয়াসলি মা থাকলে যে এতদিনে পশ্চিমবঙ্গে একটা মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যেতো সে বিষয়ে যারা মা কে সামান্য হলেও চেনেন তাঁদের হৃদয়ে কণামাত্র সন্দেহ থাকবার কথা নয়।

বৈশাখের ঠা ঠা রোদ্দুরটা মাথায় নিয়ে আমার চাইতেও বেশি একলা বাড়িটার দিকে একা একা  হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছিল সেই স্নিগ্ধ ভোরবেলাগুলোর কথা।  “চির নূতনেরে দিল ডাক-পঁচিশে বৈশাখ” এর সুর আর সাদা জামা- পাজামা-পাঞ্জাবি আর লাল পাড় সাদা শাড়ির ভিড়টার অপুর্ব স্বাতন্ত্র।

মা বাবার কল্যাণে ছোটবেলায় দিনগুলোই শুরু হতে রবীন্দ্রনাথ দিয়ে, শেষও। সেই অভ্যস থেকে বেরনোর চেষ্টাই করিনি কখনো। টাকিলায় টাল্লি হয়েও আজ অব্দি কোনদিন ভদ্রলোকের গানের সুর-কথা ভুল করিনি।

সেটাতে আমার কোনই কৃতিত্ব নেই যদিও। লোকটা ভুলতেই দেয় না যে।

কাউকে বলিনি কিন্তু খুব কষ্ট হয়েছিল ভেতরে। নিজের শহরে বুকের গহনে সারাক্ষণ নিঃশ্বাস নিতে থাকা অতি প্রিয় মানুষটার অপমানে অপমানিত হওয়ার কষ্ট।

আর মন্ট্রিয়লে ফেরবার মাসখানেক পরেও আমার বাইবেলটার দিকে তাকাতে পারিনি।

সঞ্চয়িতা বইটার নাম।

 

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. এই ব্যাপারটা আমিও শুনেছি (তবে নিজের কানে নয়, আমি দেশে যাইনি বারো বছর!)। খুব খারাপ লাগে। যে যা খুশি করে যাচ্ছে, আসল কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এগুলো নিয়ে মাঝে-মাঝেই বিভিন্ন গ্রুপে আলোচনা হয়, কিন্তু ওই পর্য্যন্তই। সত্যি, “আজকাল সবাই ঠাকুরের গান গায়। ওটাই লেটেস্ট ট্রেন্ড”। যাইহোক, এখানে এসব বলে লাভ নেই! আরো লেখা আসুক। শুভেচ্ছা রইলো,

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: