আণ্ডা কাণ্ড

এই গেল রবিবারের কথা। শনিবার রাত্তিরে এক বন্ধুর বাড়িতে অসম্ভব খাওয়া দাওয়া আর অনন্ত হা হা হি হি সেরে মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম দুজনেই। এ বয়সে কি আর এত সয়?

আর রোববার সকালটাতেই কি কম কাজ? একবার ডান চোখ বন্ধ রেখে বাঁ চোখ খোলো  তো পরমুহুর্তে দুটো চোখই টানটান খোলা অবস্থায় প্রাণপণ হিসেব করো- ম্যাক্সিমাম আর কতক্ষণ ল্যাদ খাওয়া যেতে পারে।

এই প্রাণান্তকর পরিশ্রম সামলে কোনোরকমে ভাত-ডালটা নামিয়ে ফেলে আপকামিং সন্ধ্যেটার কথা ভেবে যারপরনাই বিমর্ষ বোধ করছিলাম।  বহু যুগ পরে গুরুজিকে প্রমিস করেছি একসাথে কিছু একটা মুভি দেখব। সেই কিছু একটা যে শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়াবে সেটা ভেবেই ভেতরে ভেতরে আশংকায় রোগা হয়ে যাচ্ছিলাম।

ডকুমেন্টারি বলুন কি পলিটিকাল তর্জা – একসঙ্গে না দেখলে ঘুমই হয় না আমাদের। কিন্তু সিনেমা? নৈব নৈব চ।  আমরা এক ঘরে দুটো ল্যাপটপে মহানন্দে আলাদা আলাদা ছবি দেখতেই অভ্যস্ত। কারণ? সে দুঃখের গল্প আরেকদিন হবে। কিন্তু যে ছেলে ফার্স্ট ডেটিং এ কন্সস্ট্যানটাইনের মত বিদঘুটে মুভি দেখাতে নিয়ে যায় তাকে বিশ্বাস করার মত ঐতিহাসিক ভুল আমি এ জীবনে আর একবারই করেছি। কিন্তু ওই যে বলে,  জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে এই তিনটেই বিধাতার এমন খেল যে নিজেকে বিশেষ দোষ দিয়ে লাভ নেই।

সে যাই হোক। সারা সপ্তাহের দুঃসহ শারীরিক- মানসিক ক্লান্তি মোচনের চেষ্টায় দুপুরে  ঘণ্টাদুয়েক সলিড ঘুম দেবার পরই বুঝলাম এই শেষ বিকেলে আমার জন্য সিনেমা দেখার যম যন্ত্রণা ছাড়াও আরও এক ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করে আছে।

হাসি হাসি মুখে ময়ুখকে কফির মাগ দুটো নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখেই বুঝেছি এ পুরো সোয়াইন ফ্লু কেস। ছুটির দিনে বিকেলের কফি চিরকাল আমার ডিপার্টমেন্ট।

খোকার হল কি?

“শোন না, চল যাই গ্রোসারিটা করে আসি। ফিরেই না হয় সিনেমাটা চালাব। বেশ রিল্যাক্স করে দেখা যাবে”।

মা বলতেন, টকের ভয়ে পালিয়ে এলাম, তেঁতুল তলায় বাস। অগত্যা বিরস বদনে রাশি রাশি জামাকাপড় গলিয়ে রাস্তায় বেরিয়েই ছিটকে ওঠা শক।

“ উরে বাবারে। কতো টেম্পারেচার এখন?”

যাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি সুখদুঃখে বীতস্পৃহ ভঙ্গিতে সামনের বাড়ির ছাদটার চিমনির ন্যায় ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জবাব দিলেন “ আমি কি করে বলব। ওটা তো তুমি চেক করো। হবে মাইনাস উনিশ-কুড়ি”।

২১ শে মার্চ  অফিশিয়ালি  স্প্রিং স্টার্ট হয়েছে বাণীটিকে আমার এতোই মনে ধরেছিল যে টেম্পারেচার চেক তো করিইনি, গ্লাভস জোড়ার দিকেও অসীম জিঘাংসার বশে তাকিয়ে দেখিনি।

ফল দুর্দান্ত।

হাতের আঙুলগুলো অচিরেই বোবা হয়ে গেল।  সামনে ওই পাঁচ- ছ জন ছেলের দলটা না হাঁটলে তক্ষুনি অ্যাবাউট টার্ন করে বাড়ি ফিরে আসতাম। ওদের একজনের হাতে হেইনিকেনের বড় ক্রেটটা নজরে পড়তেই আমার নাকের ডগায় স্লোলি সাড় ফিরতে আরম্ভ করলো।

এই তো। আর সাড়ে চারশো পা এগোলেই আই-জি-এ। তখন  হেইনিকেন থেকে করোনা –কেউ বারণ করবে না।

রবিবার বাজার করতে এলে সব চাইতে বড় মুশকিল হচ্ছে বেশির ভাগ জিনিসের স্টকই দেখা যায় প্রায় শেষের পথে। তাই আই-জি-এ তে  ডিমের একটাও ফ্রেশ বক্স নেই দেখে আশ্চর্য হইনি। ভাবলাম ফেরবার রাস্তায় যে ছোটো কিন্তু ভীষণ চালু এশিয়ান স্টোর্সটা আছে সেখানে একবার ঢুঁ মারলেই চলবেখন।

কিন্তু ভাবি এক। হয় আরেক।

দোকানে ঢুকেই মাথাটা ঘেঁটে লাট।

ময়ূখকে ডেফিনিটলি আমি যাচ্ছেটাই রকম ভালবাসি কিন্তু  বেগুনের প্রতি আমার যে নিখাদ অকৃত্রিম প্রেম সেটা অ্যাবসল্যুটলি তুলনারহিত।

আর এত দারুণ রঙ এবং কোয়ালিটির বেগুন আমি এখানে খুব বেশি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।  ওমা হারানো প্রেমিকার মত সবে বেগুনগুলোর গায়ে পরম আদরে একটু হাত দিয়েছি কি না দিয়েছি,  পাশে অহো কি দৃশ্য! কচি কচি ঢ্যাঁড়শ অসীম সবুজের সমারোহে টুকি টুকি খেলছে।

হাত বোঝাই করে খেয়াল হল আরে ডিম নেওয়া হয়নি তো। আরেক দফা সরেজমিন তদন্তে বোঝা গেল, মন্ট্রিয়লে ওই বস্তুটির  ঘোরতর আকাল পড়েছে। বহু খোঁজাখুঁজির পর এক কোণে দেখি দুটি মোটে বক্স টিমটিম করছে।

কাছে গিয়ে উদ্ধার করলাম তার ভেতরে একটায় আবার বাতিল নোট আর অন্য বাক্সের ডিমগুলো কিরকম যেন অস্বাভাবিক ফ্যাটফেটে সাদা। জন্মেও দেখিনি বাবা এমন।  আমার যেখানে সন্দেহ, ময়ূখ সেখানে ঝাঁপ দেবেই, এ একেবারে চন্দ্র-সূর্য  ওঠবার মত অমোঘ।

“দেখছ কি? ওয়াও! এগুলো হাঁসের ডিম। দারুণ টেস্টি”- বলতে বলতেই বগলদাবা করে ফেলেছে তাদের।

“ তুমি শিওর? আঁশটে হবে না তো”? আমার কিন্তু কিন্তু যাবার নয়।

“সেটা বলতে পারব না। আচ্ছা তুমি গোলাপ থেকে কখনো আঁশটে গন্ধ পেয়েছ? কিংবা কেলভিন ক্লাইনের পার্ফ্যুম থেকে?”

এই অপমানের পর আমার অন্তত আর কথা বলবার প্রবৃত্তি হয় না।  মুচকি হাসিটা কমপ্লিটলি অ্যাভয়েড করে কাউন্টারে লাইন দি।

এক এক করে বেগুন-ঢ্যাঁড়শ প্যাকেটে ঢুকে যেতে থাকে। অবশেষে ডিমের গর্বিত মালিক বাক্সটা বাড়িয়ে দিতেই মহিলা সাসপেন্স মুভির দক্ষতম সিক্রেট এজেন্টের ভঙ্গিতে বললেন  “সো ইউ ওয়ান্ট বেবিজ ইনসাইড?”

আরসালানের বিরিয়ানির দিব্যি আমি কখনো কখনো কানে ভালো শুনতে পাই না। উচ্চারণে “ত”এর আধিক্য থাকলে তো একেবারেই না।  সৌজন্যে আমার মামাবাড়ির জিন।

কিন্তু আমার পাশের ব্যক্তিটির দেখলাম চোখ গোলগোল হয়ে গেছে!

“হোয়াট ডু ইউ মিন?” ফিসফিস করে শুধলেন তিনি।

“দে হ্যাভ বেবিজ ইনসাইড। মোর প্রোটিন। ইউ ওয়ান্ট ?” আমাদের আলোকিত করেন মহিলা।

মানেটা কি তার? কড়াইতে দিলেই কোঁকর কোঁ করে হাঁস শাবক বেরিয়ে আসবে? কিন্তু তারা কি কোঁকর কোঁ  করে আদৌ ডাকে?  না হলে কি করে ডাকে?  এত কনফিউশন লাইফে তার ওপরে আবার সাধ করে এই হাঁসের ছানাকে ইনভাইট করবার কোনো অর্থ আছে?

ভাবতে ভাবতেই দেখি চেঁচিয়ে উঠেছেন গুরুজি-“হেল নো! উই ডোন্ট”!

ফেরবার পথে লাজুক মুখে আমার রুমমেট বললেন “ এই—মানে— লিখবে নাকি তুমি এটা?

তাই ভাবলাম…

 

 

 

 

Advertisements

6 Comments

Add yours →

  1. darun interesting

    Like

  2. বাঃ, বেশ লাগলো ডিমের কান্ডকারি! 🙂
    হাঁসের ডিম আমাদেরও খুব প্রিয়, দেশে হাঁসের ডিম রান্না হয়েছে/হচ্ছে শুনলেই জিভে জল আসত, তাই এখানে হা-পিত্যেশ করে থাকি কিন্তু কখনো পাইনা। এই তল্লাটে ভিয়েতনামি/কোরিয়ান/চিনা/বার্মিজ যে দোকানগুলো আছে, সেখানে ওই ফুল্‌লিগ্রোন এমব্রায়ো/ফিটাস সমেত হাঁসের ডিম, খাওয়া চুলোয় যাক, ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে! আর একটা দেখেছি কালো ডিম, তার নাম আবার হান্ড্রেড-ইয়ার-ওল্ড-এগ, সেটাও একটা হরিবল/টেরিবল বস্তু হবে!

    Like

    • Seriously protodin I je koto kichu dekhi aar shikhi..:)
      It’s such a continuous process..
      Hundred year old egg ta kintu shunei bhoi korche..:)
      hee hee..
      And thank you..thank you..for everything..:)

      Like

  3. Anda r kando ta besh mojar….. Likhte thak…

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: