এক দুপুরে

“জোড়াসাঁকো  বইটার নাম। পড়ছি এখন। তুই পড়েছিস?”

পরশুদিন জিজ্ঞেস করছিলো সনু। সনু আমার পিঠোপিঠি বোন।  স্বভাবচরিত্রে বিন্দুমাত্র মিল নেই আমাদের। ও হচ্ছে আমাদের বাড়ির সত্যিকারের লক্ষ্মী মেয়ে। ছোটো থেকে ওর যা ভাল লাগে, আমি তার উল্টোটার প্রেমে হাবুডুবু খাই।

“চাঁদের পাহাড়” দেখে ফিরে যে মুহূর্তে ও আমাকে  ফেসবুকে গদগদ আপডেট দিলো “ খুব ভালো  হয়েছে। ডেফিনিটলি দেখিস কিন্তু”। সেই সেকেন্ডেই ঠিক করে নিয়েছিলাম ওটা দেখবার আর কোনও মানে হয় না। ও সিনেমা আমার যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ লাগবে।

এরকম আরও কোটি কোটি অযুত নিযুত উদাহরণ দিতে পারি। যদিও তার কোনও দরকার নেই। মোদ্দা কথাটা আপনারা সবাই বুঝতে পেরে গেছেন এতক্ষণে।

কিন্তু পরশু পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম বই, সিনেমার তাত্ত্বিক আলোচনার দিকে কেসটা আজ কোনোমতেই যাচ্ছে না।

“মাথাটা একেবারে ঘেঁটে আছে। ভাল লাগছে না কিছু” এটা যদি কারো ওপেনিং স্টেটমেন্ট হয় বুঝতেই হবে ব্যাপারটা সিরিয়াস।

কারণ জানতে চাওয়ায় অবগত হলাম তিনি সন্ধ্যেবেলায় যতো রাজ্যর পুরনো ফটো নিয়ে বসেছিলেন। অবশ্যম্ভাবি ফলাফল এই ডিপ্রেশন।

মেজ পিসি- পিসেমশাই এর অসম্ভব কাছের ছিল সনু। কথা নেই বার্তা নেই, এই দুই মক্কেলের হঠাৎ করে দুনিয়া ছেড়ে কেটে পড়াটা ওর  কিছুতেই অভ্যশ হতে চাইছে না।  যখনি চান্স পাই যথাসাধ্য সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করি ওকে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে সনুর মেজ পিসি- পিসেমশাই ভদ্রমহিলা-ভদ্রলোকের সাথে  আবার আমারও একটা সম্পর্ক ছিল।  মা-বাবা বলে ডাকতাম ওঁদের। সান্ত্বনাটা কিরকম যেন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে তাই প্রতিবারেই।

“মৃত্যুতেই কি সব শেষ? সময় পেলে লিখবি একটু কিছু এটা নিয়ে?” টাইপ করে লগ আউট করে দিলো ও।

আমাকে যারা খুব ভালবাসেন, অল্প অল্প ভালবাসেন, অপছন্দ করেন, অসহনীয় রকম অপছন্দ করেন, সার্ভে না করেও নিঃসংশয়ে এই কথাটা বলতে পারি যে তাঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু একটা বিষয়ে  সাংঘাতিক পরিমাণে একমত।

সকলেরই ধারণা আমার বয়সের তুলনায় মৃত্যুটা আমি বড্ড বেশি দেখে ফেলেছি। এতটা কখনোই দরকার ছিল না।

আসলে সমস্যাটা তো অন্য জায়গায়।  জীবন-মৃত্যু এ দুটোর একটাও ঠিক আমাদের ইচ্ছানুযায়ী চলে না তো। উল্টে আমাদেরই  মানিয়ে গুনিয়ে চলতে বাধ্য করে।

“বাধ্য করে” শব্দবন্ধটি খুব ভেবেচিন্তেই ব্যবহার করলাম এখানে।

জীবনে বিশেষ কিছু আর হারাবার না থাকলে  জীবন রিলেটেড অনুভূতিগুলো হয় ভীষণ ভোঁতা হয়ে পড়ে না হলে অতীব সূক্ষাকার ধারণ করে। আমার ক্ষেত্রে কোনটা হয়েছে সেটা বিচার  করবার ভার  যারা আমায় নিয়মিত পড়েন তাঁদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি আজ অনেকদিন।

আমার মা চলে যান রাখীপূর্ণিমার ভোররাতে, এক অগাস্টে। দিদাকে হারাই এর ঠিক সাতাশ দিন পর। আর বাবা পাঁচ মাস সতের দিনের বেশি মায়ের হাত ছেড়ে থাকতে রাজি হননি কিছুতেই। এবং কোনও এক অনিবার্য কারণে এঁদের একজনের সঙ্গেও যাকে শেষ দেখা বলে সেটা হয়নি আমার।  ভাগ্যের খেলা কথাটা মন থেকে পছন্দ করি না।  । “অনিবার্য কারণ”টাই আমার জন্য পারফেকট এক্সপ্রেশন।

এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, সময়ের পলি আর যেখানেই পড়ুক না কেন, মা বাবা দিদার গল্পে অন্তত তার ভূমিকাটা  একেবারে উলটো। একটা করে দিন যায় আর অজস্র স্মৃতির এক একটা পাতা আরও ঝকঝকে ধারালো হয়ে ওঠে।

কতো কাজ যে কমে গেছে। নিয়ম করে ফোনের কার্ড কেনবার বালাই নেই কোনও। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আনমনা হয়ে যাওয়া রোগটাও ঘুচে গেছে আপনিই।  দেশে ফেরবার তাড়াটাই তো নেই।

আর সারাক্ষণ বুকের ভেতর টানটান করে থাকা ভাবনাচিন্তা উত্তেজনাগুলো? “সব ঠিক আছে তো?”

নাহ তারাও বেপাত্তা। এক অচেনা ম্যাজিশিয়ান জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় সব পিছুটান এক টানে ভ্যানিশ করে দিয়েছেন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও একটা জিনিস কিছুতেই মগজে থাকে না । । সন্ধ্যাবেলা ফোনের দিকে চোখ পড়লেই বলা নেই কওয়া নেই ধ্বক করে ওঠে বুকটা, আরে আজ কথা হয়নি এখনো!

আমি যেকটি ব্যাপারে উপরওয়ালার কাছে চিরকৃতজ্ঞ তার অন্যতম হল, আমার প্রথম বইটা মা বাবা দেখে যেতে পেরেছেন।

শুনেছি মা নার্সিংহোমে সব্বাইকে শুধু বইটার কথাই বলতেন। নিজের যন্ত্রণা নিয়ে টুঁ শব্দ করেননি কক্ষনো।

অজানা যে জায়গাটা থেকে অবিরাম রক্ত পড়ে যায় নিঃশব্দে, কোনও মেঘলা দুপুরে তিন জোড়া গর্বে ভেজা চোখ খুব অল্পক্ষণের জন্য হলেও একটা শান্ত ঠাণ্ডা প্রলেপ বুলিয়ে দেয় তার ওপর। আরামে ঘুম এসে যায় আমার।

ঠিক যেমন অসীম ব্যর্থতার চাঁই অক্লেশে গলিয়ে দিতে পারে কয়েক টুকরো সাফল্য ঠিক তেমনি গভীর শোক জীবনকে এনে দেয় এক স্বচ্ছতর আলোর সন্ধান, উত্তরণের পথ।

মেনে নিয়েছি। প্রতিনিয়ত মানবার চেষ্টা করছি।

আর তো রাস্তা নেই রে সনু।

 

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. খুব ভালো লাগল লেখাটা পড়ে, সেইসঙ্গে কেমন একটা মন-খারাপ করা বা মন ভার হয়ে আসার মত এফেক্ট। জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি, তাই সবার মত আমিও এসবের মধ্য দিয়ে গেছি, হারিয়েছি অনেক। আস্তে-আস্তে টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার কাজ করে… সব “নরম্যাল” হয়ে যায়…, সেই হয়ত জীবন।
    এই ব্লগ-গুলো কালেক্ট করে বই পাব্‌লিশড হবে আশা করি। আগে কি কি বই ছাপা হয়েছে জানিও। আরো লেখ, ভাল থাকো। শুভেচ্ছা রইলো।

    Like

    • mon bhalo hoye gelo apnar message ta pore..:)
      I have never written in Bangla before..:)
      My first book was published by a small publisher from Germany..ekhon mone hoy lekhagulo aaro koto hole bhalo hote partoh..:)
      khub bhalo thakben..
      This bonding through words is something I cherish most..:)

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: