ম্যাজিক শেষে

আমার এক দূর সম্পর্কের দাদার হঠাৎ খেয়াল হয়েছিল ম্যাজিশিয়ান হবার। এখন সব ম্যাজিশিয়ানেরই একটা করে সহকারি থাকে, সহকারিণী হলে তো সোনায় সোহাগা।  একটু বেশি হাততালি পড়বেই পড়বে। আর যদি ভুলে টুলে কেঁচে গণ্ডূষ করেও সঙ্গে মেয়ে থাকলে অন্তত মারধোর খেতে হবে না।

বেচারা দাদা। সবে স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েছে, গার্ল ফ্রেন্ডের বালাই নেই কোনও, সহকারিণী পাওয়া কি মুখের কথা? সেটাও আবার ফ্রীতে!

দাদা গত্যন্তর না দেখে আমার মা কে এসে ধরল। মা আর কি করেন, কিন্তু কিন্তু করে অনুমতি দিয়েই দিলেন উইথ সাম কনডিশান্স। যথা স্কুল ডুব মারা চলবে না কখনোই, খুব দূরে যাওয়া যাবে না এরকম আরও কি কি সব।

আর আমাকে চুপি চুপি বললেন “শোন ওই সব বাক্স টাক্সর ভেতরে কিন্তু কিছুতেই ঢুকিস না কক্ষনো। ও সবে শিখছে তো, মোটেই ভরসা নেই!”

দারুণ কাটতো রবিবারগুলো কিন্তু। কোনোরকমে হোম টাস্ক সেরেই ম্যাজিকে হাত মকশো করা।

এরকমই একবার বরাত পড়ল এক ফাংশানে দাদার ওপর ম্যাজিক দেখাবার। আমরা তো খুব খুশী, উত্তেজিতও। যথাসময়ে পোঁটলা পুঁটলি সহকারে দাদার শুভাগমন ঘটলো। আমি তো তার আগে থেকেই নাচ গান নাটকের রিহার্সাল নিয়ে মহা ব্যস্ত। তার মধ্যই দাদাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম “সব মনে আছে তো? একবার প্র্যাকটিস করবে নাকি”?

চোখ পাকিয়ে এক রামধমক দিল দাদা “তুই থাম দেখি!সব মনে আছে আমার! এখন তুমি দয়া করে ডুবিয়ো না!” খুব দুঃখ পেলাম বলাবাহুল্য।

ঘণ্টা কয়েক পর সেজেগুজে দাদা স্টেজে। সভাপতি আবার আমাদের পাড়ার সরকার দাদু, ভাল করে ম্যাজিক দেখবেন বলে চোখ কুঁচকে এগিয়ে বসেছেন। আর ভীষণ টেনশানে বুকটা ধ্বক ধ্বক করছে আমার।

কানে বাজছে দাদার বলা কথাগুলো “আর শোন মামীকে কিন্তু অবাক করে দিতে হবে আজ!”

মামী মানে আমার মা।

তাসের ম্যাজিকে হেব্বি আসর মাতালো দাদা। কি হাততালি কি হাততালি!

তারপর ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া, পায়রা ভ্যানিশ করে দাদা যখন প্রায় সপ্তম স্বর্গে তখনি গোলমালটার সূত্রপাত।

বলা নেই কওয়া নেই পুরু ফ্রেমের চশমা নেড়ে দাদার ঘোষণা, অদ্য রজনীর শেষ ম্যাজিকের সম্মোহনেই দর্শককুলের মন কাড়তে চায় সে।

ছোটো বোনটিকে এই বাক্সটার ভেতর পুরে ফেললেই দেখা যাবে এক আসলি জাদুকরের খেল। চোখ বন্ধ অবস্থাতেও স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম কটমট করে তাকিয়ে আছেন মা।

সে যাই হোক। আমি তো বিনা প্রতিবাদে বাক্সবন্দী হয়ে গেলাম আর দাদার বক্তৃতাও চলতে লাগলো। বেশ খানিকক্ষণ পরে খোলা হবে বাক্স এবং দেখা যাবে আমি গায়েব এটাই বক্তৃতার প্রতিপাদ্য বিষয়।

অতঃপর কথার তোড় কোনোক্রমে সামলেসুমলে ম্যাজিশিয়ানমশাই তো বাক্সের সামনে এসে গম্ভীর গর্জনে বলে উঠলেন “চিচিং ফাঁক!”

আর তারপরেই বিহ্বল তিনি! এ আবার কি!

পরক্ষণেই বিহ্বলতা উধাও এবং কাঁদোকাঁদো মুখে বোনটিকে এক খোঁচা মারলেন  গত দেড় ঘণ্টা  কথার ফুলঝুরি চমকানো ক্ষুদে জাদুরাজ।

আমি চোখ খুলতেই কাঁদোকাঁদো মুখ বদলে গেল ভয়াবহ দাঁত কিড়মিড়ে!

আসলে কদিন ধরে অত হইহই আর রিহার্সালের ঠেলায় এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ওই বাক্সটার ভেতরে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে  গিয়েছিল!

তারপর? নাহ নিজের পাড়ায় কেউ কখনো মারধর খেয়েছে নাকি আজ অব্দি?

তাই চারদিকে তুমুল অট্টহাসি আর হিহি হাহার মধ্য আমার বিচ্ছিরি রকম অপ্রস্তুত তখনো বেশ ছোটো দাদার লাল হয়ে যাওয়া মুখটা একটু পরেই মালিন্যহীন লাজুক হাসিতে ঢাকা পড়েছিল।

আর তাঁর একমাত্র মেয়েটা স্লাইট ঘুমন্ত কিন্তু অক্ষত দেহে রক্ষা পাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন মা।

বলাবাহুল্য!

 

 

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. its really very funny.i really like it.

    Like

  2. দীপেন ভট্টাচার্য March 25, 2015 — 1:12 pm

    চমৎকার।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: