তাসের ঘর

রানাঘাটের কাছে চাকদাতে তখন আমার দাদু দিদা থাকতেন। আমার মায়েরও মামারবাড়ি আর মাসিরবাড়ি ছিল সেখানে। দুর্গাপুজোর সময় সে এক অবর্ণনীয় রকমের হুল্লোড় হত। আমার আজও আবছা আবছা মনে পড়ে  ভাতের হাঁড়িতে চায়ের জল চাপানো হতো ওই কটা দিন!

এটা আমার ভীষণ খ্যাপাটে সেই মামারবাড়িরই গল্প। কিন্তু এখানে গল্প ইক্যুয়ালস টু ১০০% সত্যি ঘটনা।

প্রতিটি বংশেই দেখবেন কিছু না কিছু জিনগত ট্যালেন্ট থাকে।  আমরাও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। তাস খেলাতে অসীম প্রতিভাধর আমার মাতৃকুলের প্রত্যেকটি প্রাণী। এরকম ও বলা হয়ে থাকে যে হাতেখড়ি হওয়ার আগেই হয়তো এঁদের অনেকেরই তাসে খড়ি হয়ে গেছিল।

কাকে ছেড়ে কার কথা বলি! দিদার পাওয়া শো-কেস ভর্তি প্রাইজগুলো থেকে মা-মাসি-মামাদের অগাধ তাস রিলেটেড অ্যাচিভমেন্টস সবই আমাদের অপরিসীম গর্বের বিষয়।

কিন্তু একটা নিয়ম সক্কলকে মেনে চলতে হতো। কাজের সময় কাজ, তাসের সময় তাস। একমাত্র ফাইনাল পরীক্ষার পরে আর গরমের ছুটিতে হোম টাস্কের গোছা সামলেই তাস খেলবার অনুমতি মিলত আমাদের।

শুধু সব নিয়ম হারিয়ে যেত দুর্গা পুজোর সময়, চাকদা বাড়িতে।

সে কি সব দৃশ্য!

সারা বছর পরম পূজনীয় শ্বশুরমশাইয়ের মুখের ওপর এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে নবীন জামাই বাবাজীবনের উত্তেজিত ঘোষণা “কিছুতেই আমার কলটা খেয়াল করলেন না আপনি। সব গোলমাল হয়ে গেল!”

শ্বশুরমশাইও ছাড়বার পাত্র নাকি?  জামাইয়ের সিগারেট প্যাকেট সপ্তম বারের মতো খালি করতে করতে ডাবল চেঁচিয়ে বলে উঠলেন “ ওই জন্যই তো তোমার ভাবনার সঙ্গে আমার মোটে মেলে না। আমি হলে ওটা কলই করতাম না!”

আমার ছোটমামা যেমন রোগী দেখা- হসপিটালের কড়াকড়ি- নার্সিং হোমের নিয়মকানুন থেকে সামান্য সময় চুরি করতে পারলেই বেরিয়ে পড়তেন আমাদের আর গাড়িটা নিয়ে। প্রতিবারই বালি ব্রিজ পেরিয়ে ঠিক হত কোথায় যাওয়া হচ্ছে। ঘাটশিলা, জামশেদপুর, ছোটো ছোটো নাম না জানা  কত কত অচেনা কিন্তু অপূর্ব জায়গায় পৌঁছে যেতাম আমরা কজন।

একলা দাঁড়িয়ে থাকা পুঁচকে একটা হোটেলে গাড়ি থেমেছে আর লাফিয়ে লাফিয়ে নামছি আমরা; “এক-দুই-তিন-চার” – কানে আসছে হোটেল মালিকের বউয়ের পরিষ্কার ফিসফিস। আড়চোখে ছোটমামা-মাইমা কে দেখছেন আর স্বামীর কানে কানে বলছেন ‘দেখছ কি, এই বয়সেই এতোগুলো!”

এই মাঝে মাঝেই বিলকুল লা-পাতা হয়ে যাবার উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু একটাই। তাস খেলা! স্পেসিফিকালি বললে লিটরেচার খেলবার  জন্য।

দিগন্তে কেউ কোথাও নেই, কোনোক্রমে ডাইনিং হলে গিয়ে লাঞ্চ-ডিনারটা সারা আর বিকেলে একটু নাম কা ওয়াস্তে নদীর ধারে চক্কর মেরে আসার সময়টুকু বাদ দিলে আমরা ইহজগতে থাকতাম না।

এটা হয়েছিল বোধহয় ঘাটশিলাতে। সেটাই সেবারের মত আমাদের শেষ রাত্রি। এলোমেলো জামাকাপড়- উলোঝুলো চুলে “কেন অতোগুলো মিসড কল দেওয়া সত্ত্বেও সনু ডায়মন্ডের টেক্কাটা আমার কাছে আছে গেস করতে গড়বড় করলো” সেই দুঃখে আলুথালু  ডাইনিং রুমে উদিত হয়ে দেখি আরেকটা দল এসে পৌঁছেছেন সম্ভবত কিছুক্ষণ আগে।  তাঁদের পরিপাটি সুবেশ হতচকিত চেহারা এ জীবনে ভোলবার নয়।  “এত পাগল একসাথে আর দেখা যাবে না” নির্ঘাত এরকমই কিছু ভেবে নিয়েছিলেন ওঁরা।

এরকম অজস্র হীরেমানিকের ভেতর এখন যেটা বলব আপনাদের সেটা একেবারে সার্টিফায়েড কেস।

সেবার ছোটো মাসির শ্বশুরবাড়ির দিকের দুজন এলেন চাকদাতে, তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য আমাদের তাসখেলা প্রত্যক্ষ করা। এতো শুনেছেন এদের তাস পাগলামির কথা, আর থাকতে পারেননি তাই। তাঁরা নিজেরাও বেশ কেউকেটা এই লাইনে আফটার অল!

কুটুম বলে কথা! আদরযত্নের বান ডেকে গেল তাঁদের জন্য। এক বেলা গেল। রাত্তিরটাও মোটামুটি ঠিকই ছিল মনে হল। পরের দিন দুপুরের দিকে হঠাৎ একটা হইহই শোনা গেল দোতলায়।

আমরা, ক্ষুদ্র তাসকর্মীবৃন্দ সব ছুটে গেলাম সঠিক তথ্যের সন্ধানে।

এবং সামান্য অনুসন্ধানেই বোঝা গেল ব্যাপার খুবই গুরুতর।

ওই ভদ্রলোক দুজন সেন্সলেস হয়ে গেছেন। হ্যাঁ মানে দুজনেই। এই ভয়ংকর তাস খেলবার ঠেলা আর সামলাতে না পেরে।

সে যাই হোক।  জল টল ঢালবার কিছুক্ষণের মধ্যই উঠে বসলেন ওঁরা।

ভেজা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বাইরের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে বলে উঠলেন একজন, “ঢের ঢের খেলুড়ে দেখেছি কিন্তু বাবার জন্মেও এমনটি দেখিনি! বাড়ি ভর্তি ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার কিন্তু হাতে তাস পেলেই কারুর এতোটুকু হুঁশ নেই! এ কি সব্বনেশে খেলা!”

নাক কান মুলে কয়েক ঘণ্টা পরের কলকাতার ফিরতি ট্রেন ধরেছিলেন তাঁরা, আমাদের যারপরনাই লজ্জিত অবস্থায় ফেলে।

চাকদা বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে আজ বহুদিন। সেই সাঙ্ঘাতিক ফুর্তিবাজ মানুষগুলোর অনেককেই হাজার ইচ্ছে করলেও দেখতে পাই না আর। যারা রয়ে গেছেন ভাঙ্গা মন নিয়ে, তাঁদের হাতে তাস ওঠে না।

শুধু থেকে গেছে এইরকম কিছু টুকরো মুহূর্তের নির্যাস, স্মৃতি যার আরেক নাম।

 

 

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. Lekha ta poRlam (Rohon Kuddus er shared link theke). Khub bhalo laaglo – sundor jhokjhoke lekha. Onyo lekhagulo o poRbo.
    Ei lekhar prothom line ei Chakda – aamar jaayga. Tarpor Montreal dekhe mone holo Dipak-da/Nila-dir chena-jana hoben nischoy! 🙂

    Like

    • Thank you so much..:)
      keep reading..keep letting me know what you feel..:)
      I still miss Chakdah and the people around..
      arekta kotha..amake kintu keu apni bole na..:)
      Nila mashider chini..

      Like

      • ইন্দ্রানী, তোমার ব্লগ-টা “Follow” মার্ক করলাম, যাতে নতুন পোস্ট এলেই জানতে পারি। দীপক-দা বলেছিলেন, “নীলামাসি, মেসো” বলেই তুমি চিনবে! সে যাই হোক, খুব ভাল লেখার স্টাইল তোমার, কিপ অন রাইটিং। অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

        Like

  2. Thank you so much..:)
    Your good wish is something I treasure most..:)..Neela mashi..dipak jethu bole daki..:)
    Porte thakben..aar ecche holei amake likhben..:)
    will look forward to..:)

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: