আপ রুচি

মন্ট্রিয়লে আমাদের পাড়াটা বেশ পাঁচমেশালি হবার দরুণ কখনো কখনো জাস্ট জানলার বাইরে চঞ্চল রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকাটাই খুব ইন্টারেস্টিং হয়ে যায়।  নানা ভাষা-নানা মত ( এই শীতকালে নানা পরিধান বললে ডাহা মিথ্যে বলা হবে, দলমত নির্বিশেষে সবাই নিজের  মাথা টু পায়ের আঙ্গুল অব্দি যেনতেনপ্রকারনে মুড়ে রাখতে পারলে বাঁচে।) ছাড়াও এই জায়গাটার  আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল চারপাশ অজস্র রকমের খাবারের দোকানে বোঝাই।  ভিয়েতনামি স্যুপের জন্য প্রাণ আনচান করছে? বাড়ি থেকে ঠিক গুনেগুনে আটশ পা হাঁটলেই হবে। এই মুহূর্তে লেবানিজ খাদ্যের দর্শন না পেলে এ জীবন রেখেই বা লাভ কি মনে হচ্ছে ?  কিংবা মেক্সিকান বুরিতোর জন্যই যে এখনো চন্দ্র- সূর্য উঠছে এরকম ফিলিং ?  জার্মান বেকারিই চান কি ফরাসি ফরমাশ- সব এক্কেবারে হাতের কাছে মজুদ।

আর হালের এই দক্ষিণ ভারতীয় ইটারিটির  রমরমা এমন বৃদ্ধি পেয়েছে যে দূরদূরান্তের জনগণ যখন কোথায় থাকি জিজ্ঞেস করেন, আমরা বলি “—-” য়ের পাশের ব্লকেই আর সঙ্গে সঙ্গে মুখগুলো কিরকম বদলে যায় ‘ ইস! তোমরা কি লাকি’! যদিও আমাদের পদধুলি অসম্ভব রেয়ার সেই রেস্তোরায়।

অন্যান্য সর্ববিষয়েই আমার খুব সুস্পষ্ট মতামত থাকলেও এই খাওয়াদাওয়া সংক্রান্ত ব্যাপারে আমি একনিষ্ঠ ভাবে আমার গুরুজিকে ফলো করে থাকি।  রোজকার ভাত-ডাল- ডিমের ডালনাতে কন্ট্রিবিউশন রাখলেও চিকেন আলাকিয়েভ বানাতে  কি সাজসরঞ্জাম লাগতে পারে সেই সম্পর্কে আমার জ্ঞ্যনগম্ম্যির কাগজেকলমে সাক্ষী রেখে আর কি হবে? তাই এইসব এক্সকুইসিট কুইজিন যেদিন রান্না হয় সেদিন  গুরুজির প্রতিটি বাক্য সর্বান্তকরণে মগজে  নিয়ে আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট পোস্টে আসীন হয়ে চিজ টিজ স্লাইস করে দেবার মতো ছোটোখাটো কাজের বরাত পাই।

এবার হয়েছে কি, কনফারেন্সে গুরুজি যাবেন ওয়াশিংটন। সপ্তাহখানেকের জন্য । ফ্রিজ ভর্তি রান্না করে, না খেয়ে থাকবার কুফল সম্মন্ধে হাজার তিনেক সদুপদেশ দিয়ে  অবশেষে যাত্রা করলেন তিনি।

ফ্রিজের খাবার কতদিন খাওয়া যায় আর? একার জন্য খাবার কিনে আনা? দূর সেসব পোষালে তো হয়েই যেতো। পিৎজা-বার্গার আমার সিস্টেমে বিলকুল সয় না।  আলু-ডিম ভাতে ঘি দিয়ে? খাইনি আপনাকে বলেছি বুঝি?  তাতেও কি সাতদিন আটরাত্রি কাটে?

অগত্যা গুটিগুটি পায়ে মার্শে ভিক্টোরিয়া; এ অঞ্চলের সবচাইতে পুরনো ইন্ডিয়ান গ্রসারি ষ্টোর।  গুরুজি বিহনে এদিক ওদিক মা হারা হরিণ শিশুর ন্যায় দিশাহীন ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎই চোখ পড়লো এক কোণে লুকিয়ে থাকা বাক্সটার ওপর। দেখি সেটাও ভীষণ অভিমানী অবহেলিত মুখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

উঁকি দিতেই মনে হল একটানা সাড়ে সাতচল্লিশ ঘণ্টা বরফ পড়বার পর রোদ্দুর উঠলো এইমাত্র।

আহ! আর ভাবনা নেই। সাতদিন আটরাত্রি কেন সাতাশ দিন আটশ রাত্রিও আমি এই খেয়েই বহাল তবিয়তে উইদাউট এনি কমপ্লেন চালিয়ে দিতে পারি।

যাই হোক। গুরুজি রিটার্ন করলেন পরের শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা। এসেই দেখলেন টেবিল রেডি। তাঁর ম্যাকডোনাল্ড ক্লান্ত জিহ্বাকে রেহাই দিতে প্রস্তুত গরম গরম  তখনো ধোঁয়া উঠছে বাঙালি প্ল্যাটার।

নাক কুঁচকে একঝলক পরিস্থিতিটা  জরীপ করে গুরুজি বললেন “ চোখের কোণে কতোটা কালি পড়েছে দেখতে পাচ্ছ? এই কদিন সেই ম্যাগি খেয়েই থাকলে তাহলে? এত ভাল লাগে ওই বস্তুটা?”

নাম মনে পড়ছে না কোনও এক শাস্ত্রে  শুধুমাত্র ঠিক এই কারণেই গোটা একটা চ্যাপ্টার আছে এক ছাদের তলায় একটাই লোকের সাথে অনন্তকাল বাস করবার সমূহ বিপদ নিয়ে। হাড়ে হাড়ে  দুজন দুজনকে চিনে যাওয়াটা কিন্তু মোটে ভাল কথা নয়। মহান গ্রন্থটির নাম মনে পড়লেই আপডেট করে দেব এই লেখাটা। প্রমিস।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

2 Comments

Add yours →

  1. ata darun laglo pore.khub sundor hoiche lekhata

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: