শেষ নাহি যে

হয়তো এর মধ্যই আপনাদের কেউ ব্যাপারটা একটু হলেও ধরে ফেলেছেন আর মনে মনে বলছেন “ভারি আশ্চর্য তো”!

একেবারে ঠিক ভাবছেন কিন্তু। এই রোজনামচার প্রতিটা পাতা  যেহেতু আসলে আমারই জীবনের ছোটো ছোটো টুকরো মুহূর্তের সাদাকালো ছবি , তাই কুচিকুচি মজার সাথে এখানে ঘুরেফিরে আসে আমার ফেলে আসা শহরটার কথা, বুকের ভেতরে নিশ্বাস নিতে থাকা বাড়িটার ধীরে ধীরে একলা হয়ে যাওয়ার কাহিনি, আর হারিয়ে যাওয়া মায়ের ফোঁটা ফোঁটা গল্প।

কিন্তু কোত্থাও বলা তো দূরে থাক, সত্যি বলতে কি সযত্নে যেটা এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করে চলেছি এই এতক্ষণ তা হল আমার বাবার কথা।

শুধু এই লেখায় নয়, সারাদিন প্রতিমুহূর্তে এই একটা চিন্তা কখনো পিছু ছাড়ে না আমার। যতো ভুলতে চাই ততই তাড়া করতে বেড়ায়।

বাবা চলে যাবার পরের দিন -৪০ ডিগ্রী ছুঁয়েছিল তাপমাত্রা। আমি ল্যাবে গিয়েছিলাম। আর তো কোথায়ও যাবার ছিল না আমার।

ময়ূখ খুব ভয় পায় মনে মনে  আমি জানি। ওর ধারণা বাবার চলে যাওয়াটা আমি এখনো বুঝতেই পারিনি। যেদিন পারব সেই দিনটার কথা ভাবতেও চায় না ও।  খুব ছেলেমানুষের মত ভাবনা যদিও।

বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা কিরকম ছিল বলবার চেষ্টা করবার কোনও মানেই হয় না। বাবা আর মেয়ে মানেই সচরাচর একটা অন্য বন্ধন।  কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটার গভীরতা সম্ভবত একটু অন্যতর মাত্রার ছিল।

চোদ্দ বছর বয়সে জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তি পড়ি শুধু বাবার সাথে আলোচনা করতে পারব বলে। কি বুঝতাম সেটা আর দয়া করে জিজ্ঞেস করে বসবেন না!

মা দেখতে পারতেন না,কিন্তু খুব প্রিয় ছিল আমাদের দুজনেরই –বৃষ্টি। অঝোর ধারার মাঝে বারান্দায় বাবা পড়ে শোনাচ্ছেন কিছু না কিছু, এই আলোছায়ার খেলা চোখে নিয়েই আমার বেড়ে ওঠা।

মায়ের কাছে শুনেছি, আমার যখন এক বছর বয়স, ছোটোদের রঙিন ছবিওয়ালা অজস্র বই এনে হাজির করতেন বাবা। আমি হাতে নিতাম আর ছিঁড়ে ফেলতাম। পরের সপ্তাহে আবার নিয়ে আসতেন।

দাদু বলতেন “কেন আনিস এভাবে? ওকে আরেকটু বড় হতে দে। বই কি ও বোঝেই না এখন”।

বাবা আস্তে আস্তে জবাব দিতেন “ছিঁড়ুক না। ছিঁড়তে ছিঁড়তেই শিখবে”।

আড়াই বছর থেকে যুক্তাক্ষরহীন খবরের কাগজ পড়তে পারতাম  হয়তো এইজন্যই।

পাঁচ বছর লেগেছিল কাজটা করতে, ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজারের সমস্ত দায়িত্ব সামলে ইংরেজির দুর্দান্ত ছাত্র বাবা একটা সম্পূর্ণ হাতে লেখা ডিকশনারি বানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর অতিরিক্ত কৌতূহলী মেয়ের জন্য।

প্রতিটি শব্দের সমার্থক, বিপরীতার্থক তাবৎ ডিটেল সহকারে। তখন গুগল ছিল না কিন্তু। কপি পেস্ট সিনারিওর তো প্রশ্নই ওঠে না।

সেই বাবাই কিন্তু আমাকে কোনোদিন কমিকস পড়তে দেননি, ছবি দেখে পড়বার অভ্যাশ চলে  যাবার আশংকায়।

একদিনের জ্বরে চলে গিয়েছিলেন, চিকিৎসা করবার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেননি কাউকে। জানি না আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিনা।

কিন্তু আমার যে অনেক কিছু বলবার থেকে গেছে আজও।

তাই এইটুকু থাক শুধু বাবারই জন্য।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: