ভুলে ভুলে

আমি তখন ক্লাস এইট বোধহয়। মা বাবার সাথে লাফাতে লাফাতে গেছি সাউথ ইন্ডিয়া। বাবার কাজের সাথে তাল মিলিয়ে ছুটতে ছুটতে মা আর আমি দুজনেই হাঁফিয়ে গিয়েছিলাম বেশ। আর ক্রমাগত সমুদ্র দেখে দেখে স্লাইটলি বোরড চোখ দুটোও  বাবার কোডাইক্যানাল যাবার প্রস্তাবে  তাই হেব্বি খুশি হয়ে গেল।

মোটে দেড়দিনের জন্য যাওয়া, ফিরেই বাবাকে আবার ব্যাঙ্কের ক্রেডিট ব্যালান্স নিয়ে  বসে যেতে হবে।   কিন্তু তাতেও ঘুম আসছিল না রাতে উত্তেজনায়।

ছোটবেলা থেকে জ্বালিয়ে চলা ভারটিগোকে গুলি মেরে কোডাইক্যানালকে  আরও নিবিড় করে পাবার জন্য উঁকিঝুঁকি মারবার সময় খটখটে দিনের বেলাতে চাঁদের আলোর বিলকুল রেশ না থাকা সত্ত্বেও বেশ যে একটা ‘ মরি যদি সেও ভাল- সে মরণ স্বর্গ সমান’ টাইপের ফিলিং হচ্ছিল সেটা একেবারে চটকে গেল হু হ করে বিটকেল জ্বর এসে যাওয়ায়।

পরেরদিন মায়ের কটমটে চাউনি অগ্রাহ্য  করে দিব্যি দৌড়ে দৌড়ে নামছি আমাদের গাইড বাবাজীবনের সঙ্গে, সে নাকি আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে চলেছে যেখানে পৃথিবীর কোটি কোটি ফিল্মের শুটিং হয়েছে। এটা খুব একটা দরকারি তথ্য নয় যদিও আবার দরকারিও বটে।

এত এত  হিরো হিরোইন নেচে আপ্লুত হয়েছে যেখানে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিশ্চয় মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতনই।

বেশ খানিকটা অবতরণ করবার বুঝলাম এবার বাবার হাত না ধরলে পতন অনিবার্য। এখানে  আসতে হলে রীতিমত ট্রেনিং থাকা চাই। আমার পায়ে আবার গত পুজোতে বহু গবেষণার ফলশ্রুতি হিমালয় সদৃশ হিলওয়ালা পাম্প শ্যু!

মনে মনে  গাইডের মুণ্ডুপাত করতে করতে দেখি বাবা ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন “চল যাই। তোর মা আসবেন না এখানে। খুব রেগে গেছেন তোর ওপর। কেন যে আগে আগে এলি। এখন তো শেষ না দেখে ফেরাও যাবে না আর।  রাস্তাটাই আলাদা”।

অনুতপ্ত মুখে হাঁটছি মানে নামছি আর ভাবছি কি ঝাড়টা ওয়েট করছে মায়ের মুখোমুখি হলেই, সেই ঝড় কি করে সামাল দেব ভাবতে ভাবতে সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম।

হঠাৎ মনে হল হাতে যেন টান পড়ছে। মানে আমি নেমে যাচ্ছি কিন্তু বাবা সেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।

ভ্রূ কুঁচকে মুখ ফেরাতেই ভ্রূ টং করে সোজা আর মুখটা ততোধিক হাঁ হয়ে গেল আমার।

বাবা কোথায়?  এতো ভয়ংকর নাবালক দেখতে এক সদ্য সাবালক! আমি যত তাড়াতাড়ি নামবার তাড়নায় সেই লাজুক আঠারো-উনিশের হাত ধরে টানাটানি করেছি সে ততই লজ্জায় কাঠ হয়ে গেছে!

দেরি না করে একলম্ফে তার সামনে পৌঁছে গেলাম আমি। যা করবার আমাকেই করতে হবে চটপট। ছেলেগুলো কোনোদিনই কিস্যু পারে না। মেয়েদের সামনে তো আরই না!

ছোটো করে কেসটা ক্লিয়ার করে সরি টরি বলে  পরিস্থিতি মোটামুটি আয়ত্বে এনে সবে  ভাবছি এবার তো বাবার খোঁজ শুরু করতে হয়। গেলেন কোথায় ভদ্রলোক।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরে তাকাতেই সেই যে ভ্রূ কুঁচকে গেল আমার সে আবার সোজা হতে পাক্কা সাড়ে তেইশ ঘণ্টা লেগেছিল।

দেখি কি আমার সাংঘাতিক হ্যান্ডসাম বাবা স্মার্টলি নেমে আসছেন এক সুন্দরী মহিলার হাত ধরে।

আমার মায়ের চাইতে সুন্দর নয় অবশ্য!

“বাবা”! আমার আর্তচিৎকারে গাছের পাতাগুলোও চমকে ফিরে তাকিয়েছে আর বাবা তাকাবেন না?

পলক ফেলেই কিন্তু যারপরনাই নার্ভাস হয়ে গেলেন বাবা।

তারপর আর কি?

আরেকপ্রস্থ ক্ষমাজ্ঞ্যপন। এবারো মহিলা পক্ষ থেকে।

আর সব চাইতে দারুণ কাণ্ডটা হয়েছিল একেবারে শেষে।

বাপ-বেটির অ্যাডভেঞ্চার শুনে মা এত হেসেছিলেন যে আমাকে বকুনি দেওয়ার কথা মনেই পড়েনি তাঁর।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: