পায়েস এবং খিচুড়ি

দেখুন রন্ধনে সবাই যে কিছু দ্রৌপদীসম স্কিল নিয়ে জন্মাবে এমনটা আশা করা কিন্তু মোটেই ভাল কথা নয়।

আর হেরিডিটি ব্যাপারটাও এই রান্নার ক্ষেত্রে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে নাও মিলতে পারতে পারে। এই আমাকেই দেখুন না কেন। আমার দিদা মা ছোটোমাসি সব রান্নাঘরের  এক একজন দিকপাল শিল্পী আর আমি একেবারে তাঁদের কূলে এক বাদশাহি কলঙ্ক।

কিন্তু সেজন্য সবচাইতে বেশি দায়ি আমার মা। ভদ্রমহিলা আমাকে রান্নাঘরের চৌকাঠ মাড়াতে দেননি কখনো।

“যথেষ্ট জ্ঞ্যনকাণ্ড আছে তোমার। রান্নাবান্না কিছু রকেট সায়েন্স নয়, সংসার শুরু করলে দুদিনে শিখে যাবে। পড়াশোনাটা মন দিয়ে কর, ওটাই  তোমার কাজ এখন”, এই ছিল ভদ্রমহিলার স্ট্যান্ডার্ড বুলি।

আর আমিও জন্মবিচ্ছু হলেও এই মাতৃবাক্যটি অবহেলা করিনি কখনো।

সে যাই হোক । মাতৃদেবী তো সময়ের বহু আগেই টাটা করে দিয়েছেন আমাকে। কিন্তু তারপরেও যে আমার রান্নার তেমন বোলবোলাও হল না তার জন্য একমাত্র এবং সম্পূর্ণ রূপে দায়ী ময়ূখ।

বাড়িতে এরকম এক অসামান্য শেফ থাকলে দ্বিতীয় বাসিন্দার কখনো রান্নার উত্তরণ ঘটতে পারা সম্ভব?

নিউরোসায়েন্সের উন্নতিসাধন ছাড়া ওর জীবনের একটাই উদ্দেশ্য, সেটি হচ্ছে এই রোগাপটকা আমিটিকে একটু পাতে দেবার যোগ্য বানানো।   তায় মা বাবাও নেই, ওরই ওপর ভুবন সরি আমার সমস্ত ভার!

একটু সময়  পেলেই একটার পর একটা খাবার বানাতে থাকে ও, দেশি-বিদেশি, যেমন খেতে তেমন তাদের রূপ। যাদের নামও আমি উচ্চারণ করতে পারি না  কি একবার দুবার করলেও ভুলেই যাই মোস্টলি।

কিন্তু বিশ্বাস করুন খিচুড়িটা কিন্তু আমি দুর্দান্ত বানাই। হোস্টেলে যাবার আগে মা ওই একটি বস্তুই কি করে বানাতে হবে তার ট্রেনিং দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। রণে বনে জলে ক্যাম্পিঙে সেই ছিল আমার ত্রাতা।

কিন্তু এতক্ষণে আপনারা যেটা সঠিক বিশ্লেষণ করে বুঝে ফেলেছেন সেটি হচ্ছে আমি মানুষটা যাচ্ছেতাই রকমের অদ্ভুত।  হক কথা কিন্তু। না হলে কি করে হঠাৎ ভুলে গেলুম খিচুড়ির অমন মূল্যবান রেসিপিটা?

সে এক বিচ্ছিরি কাণ্ড। হয় নুন বেশি, নয় তো বিটকেল শক্ত, তীব্র হলুদ কিংবা সুজির মত পিস পিস, এক খিচুড়িই বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে দিল।

ময়ূখ পর্যন্ত চিন্তান্বিত হয়ে পড়ল। “এ আবার কি? এরকম করে ভুলে মেরে দিলে কি করে বল তো? তাও এত বছর পরে”?

বলব কি? আমিই কি আর জানি ছাই। মাকেও হাতের কাছে পাবার কোন চান্স নেই যে ঘ্যানঘ্যান করে জিগেস করব সল্যুশনটা।

এর মধ্যই এসে গেল ময়ূখের জন্মদিন। পায়েস জিনিসটা আমাদের দুজনেরই কিছু প্রাণপ্রিয় নয় বলে এর আগে কখন বানানো হয়নি। কিন্তু হাজার হোক জন্মদিন তো। অল্প করে একটু বানিয়ে দেখিই না।

আমার আবার ছোটো থেকেই গুচ্ছ রেফারেন্স পড়বার অব্যশ। এক বই পড়ে কখনো পরীক্ষা দিইনি।

ইউটিউবে বেশ তিন চারটে ভিডিও দেখে তাতে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে পায়েসের রেসিপি তো নামলো। আহ সে যদি আপনারা দেখতেন! লিখতে লিখতেই জিভে জল আসে প্রায়।

এরপর এক শুভক্ষণে দুধ চাপল স্যসপ্যানে। প্রথমেই প্রবল এক খটকা। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না ওই ভিডিওগুলোতে সবাই অত কিপটে কেন? অতখানি দুধে ওই একটুখানি একমুঠো চাল?

ভ্রূ কুঁচকে ভাবতে ভাবতেই আর একমুঠো চাল দিয়ে দিলাম প্যানে, পাঁচমিনিট যেতে না যেতেই আর একমুঠো।

তারপরে বেশ হৃষ্টচিত্তে নাড়তে শুরু করলাম মিশ্রণটাকে । ঠিক যেমনটি বলেছে তেমন করে।

নেড়ে নেড়ে হাতের নড়া খুলে গেল কিন্তু মা যখন বানাতেন সেই যে একটা প্রাণকাড়া সুগন্ধ বেরুত, পায়েসের একটুও ভক্ত না হয়েও টুকটুক করে দিব্যি খেয়ে ফেলতাম এক বাটি সেই গন্ধটার তো কোনও নামগন্ধই নেই!

দুঃখের গল্প ছোটো করে শেষ করতে হয় জানেন তো? ঘণ্টাদেড়েক পরে যে রাবারের মত বস্তুটি বেরলো সেটি গারবেজ বিনে গেলেও ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আমার খিচুড়ি বানানোর হারানো স্কিল টা কোথা থেকে যেন ফিরে এসেছে আবার।

পারফেক্ট হচ্ছে খিচুড়ি এখন।

কি শান্তি!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: