এই বসন্তে

আজ মোটেই পেনসিলে পোস্ট করবার কথা নয়।

আর আমারও এখুনি এখুনি কুঁড়েমি হঠিয়ে  মগজ খাটিয়ে লিখতে বসবার বিন্দুমাত্র মতলব ছিল না।  কিন্তু গানটা সকাল থেকে এমন কানের কাছে গুনগুন করছে যে ওটাকে বিদায় না করতে পারলে আমার সারা দিনটাই চৌপাট  হয়ে যাবে। আরে সেই গানটা যেটা আমাকে এক মুহূর্তে  আমার মায়ের ছোটবেলার পৌঁছে দিত বহুদিন পর্যন্ত ।

আমার মা জন্মেছিলেন কানপুরে। ডিফেন্স কলোনির ডিসিপ্লিন্ড আলোবাতাসে বড় হওয়া মায়ের জীবনে সবচেয়ে মজার উৎসব ছিল হোলি। ইনডিসিপ্লিন্ড হওয়ার ওরকম সুযোগ বছরে একবারই মিলত মায়েদের।

“আগের দিন থেকে বড় বড় লোহার বালতিতে রঙ গোলা হত বুঝলি। আর আমাদের পিচকিরি গুলো কিরকম ছিল তুই ভাবতেই পারবি না। ইয়া ইয়া পেতলের পিচকিরি। কলোনির গম্ভীরতম মানুষটির (আমার দাদুর এক বন্ধু)  মুখেও বিচিত্র এক রঙ্গিন হাসি দেখা যেত সেদিন। আর সন্ধ্যে হলেই বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিতরণ। গরম জিলিপি-সিঙ্গারা-সেউ আসছে তো আসছেই”- কথাগুলো আবছা হয়ে আসতো আর আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম মায়ের চোখদুটো বরানগরের গলির সীমানার তোয়াক্কা না করে দৌড়ে পালাচ্ছে- অন্য কোথাও।

কিরকম একটা না বোঝা কষ্ট হত আমার। মাকে আদর করে দিতাম জড়িয়ে ধরে আর মনে হত হেমন্ত গানটা মায়ের হারিয়ে যাওয়া হোলির কথা ভেবেই গেয়েছেন বুঝি। না হলে “ মুছে যাওয়া দিন গুলি আমায় যে পিছু ডাকে- স্মৃতি যেন আমারই হৃদয়ের বেদনার রঙে রঙে ছবি আঁকে” –র কোনও মানেই দাঁড়ায় না।

বলাবাহুল্য আমাদের বাড়িতে দোলকে হোলিতে পরিণত করেছিলেন মা-ই। একটু দেরিতে খেলতে শুরু করতাম আমরা। পাড়া হিসেবে সময় ভাগ করা থাকতো। অনন্যা- গোপাল লাল ঠাকুর রোড-টবিন রোডের প্রতিটি বন্ধুর বাড়িতে ঢুঁ মেরে যতক্ষণে বাড়ী ঢুকতাম ততোক্ষণে মা-কাকিমা- পাশের বাড়ির কাকিমারা- জেম্মাও নেমে পড়েছেন ফিল্ডে।

মায়ের প্রথম কাজ ছিল বারান্দায় এক কোণে বইয়ে মগ্ন আমার চিরশান্ত বাবাকে এই টোটাল কেওসটায় একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্ট নিতে বাধ্য করা।  সামান্য প্রতিবাদের পরে মৃদু হেসে আবদারটা মেনে নিতেন বাবা। মায়ের জ্বলজ্বলে হাসিটার চাইতে বড় কোনও মোটিভেটিং ফ্যাক্টর দরকার হয়নি বাবার কখনো।

“মেয়েটার কিন্তু সামনে পরীক্ষা” মনে করালে মা বলতেন “ বছরকার মধ্যে একটা দিন রঙ খেলবার জন্য যদি তোমার মেয়ে পাঁচ নম্বর কম পায়, বুঝতে হবে ওটা ওর প্রাপ্যই নয়”- এমন জলবৎ তরলং সমাধানের পরে কি আর বলবেন বাবা!

বড় হওয়ার সাথে সাথে দেখছিলাম কিরকম একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে পাড়ার দাদা-দিদিদের ইক্যুয়েশনগুলো। সবটা বুঝতে পারতাম না যদিও। যেমন কি দুঃখ পেয়েছিলাম “ -” দাদা  “ -” দিদির গায়ে এক বালতি আবিরগোলা জল হুড়হুড় করে ঢেলে দেওয়াতে।

“দেখলে তো “ -” দিদি কিরকম খেপে গেলো তোমার ওপর। এই জলটাই যদি আমার গায়ে ঢালতে কি ভালই হত। কি দারুণ মজা হত বলো। আর আমি একটুও চেঁচাতাম না। ইস!” – আক্ষেপ আর শেষই হয়না আমার।

“তুই থামবি”? লাল-সবুজ দাঁত খিঁচিয়ে হুমকি দিয়ে উঠলেন দাদা। “আহ্লাদে বাঁচি না। দুদিন অন্তর জ্বরে কোঁ কোঁ করে কাকিমাকে জ্বালিয়ে মারে আর ওনার গায়ে জল ঢালতে হবে!”

এতটা বলবার পর আমার করুন মুখ দেখে দয়াপরবশ হয়ে আরেকটি লাইন যোগ করলেন দাদা, “ আর পাঁচ বছর আগে জন্মাতিস যদি, তোর গায়েই ঢালতাম। বোঝা গেল কিছু? এবার ভাগ এখান থেকে”!

অসামান্য প্রকৃতির স্টুপিড ছিলাম তাই বোঝা যায়নি কিছুই।  ভাগ্যিস যায়নি।

সম্ভবত বুঝতে পারেনি ব্যাঙ্গালোরের সেই ছেলেটাও।  হোলি উপলক্ষে আমার মাথায় ডিম ভাঙ্গতে চেষ্টা করবার অপরাধে যার হতচকিত গালে টেনে চড় বসিয়েছিলাম একটা।

কাল রাতেও অল্প অল্প বরফ পড়ছিল মন্ট্রিয়লে। ধু ধু সাদা জানলার বাইরে দেখতে পেলাম রঙ খেলা শেষ। হাওয়াতে উড়ছে আবির মাখা মায়ের চুল। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে পুজো সেরে নেমে আসছেন বাবা, হাতে রাধাকৃষ্ণের পায়ে ছোঁয়ানো আমার আর মায়ের প্রিয় কালাকাঁদ।

দোল আসে। দোল যায়।

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: