দৃশ্য ২ – আমার বলার কিছু ছিল না

ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর:

ঘুমভর্তি আধখোলা চোখে আমি সমেত প্লেনটা নামল ফ্রাঙ্কফুর্টে। দফায় দফায় অসহ্য বিরক্তিকর  চেকিং সেরে সামলেসুমলে বসলাম একটা চেয়ারে, আরেকটাতে বেশ  পদযুগল উন্নীত করে। উপায় কি বাবা। সামনে ছ’ঘণ্টার অনন্ত প্রতীক্ষা।

মুরাকামি শেষ। সাতপুরনো  ম্যাগাজিনগুলো দেখে দেখে  মাইগ্রেন প্রায় হব হব, দেখলুম আমার ঠিক পাশটিতেই কখন যেন এসে বসেছেন ভদ্রলোক। অতীব সৌম্য চেহারা, ইহজগতে আমার  জ্ঞ্যন ফিরেছে দেখে একটু  মৃদু হাসলেন। আর  হাসিটা দেখেই আমার স্মরনাতীতকাল আগে দেখা এলিফ্যানটা কেভের বুদ্ধমূর্তি টার কথা মনে পড়ে গেল।

পাশে এরকম সহৃদয় হাসির প্রতিবেশী থাকলে বুকে ভরসা আসবেই। হলেই বা কয়েক ঘণ্টার জন্য? ওয়শরুম যেতে হবে না বুঝি? তখন তো মালপত্র সব এঁরই জিম্মায় দিয়ে …

আমি ওয়শরুম থেকে ফিরলাম আর উনিও সেদিকে যাত্রা করলেন। তারপর ফিরে এসে গুছিয়ে বসতেই আলাপটা হয়ে গেল দারুণ।

পিটসবার্গে বাড়ি, চাকরি বাঙ্গালোরে। ছুটি কাটিয়ে ফিরছেন।

মনটা স্বভাবতই একটু বিষণ্ণ থাকবার কথা। আমি খুব একটা কথা বলতে চাইছিলাম না সেটা ভেবেই।

এটাসেটা বলবার পর মনে হল উনি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইছেন কিন্তু বলি বলি করেও বলতে পারছেন না কিছুতেই।

কিছু বলবেন? নরম গলায় শুধলাম আমি।

সব দ্বিধা এবং গলা একই সঙ্গে ঝেড়ে ব্যাকুল কণ্ঠে ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ইয়ে মানে তুমি এতদিন বাড়ি ছেড়ে দূরে আছো, তো ইন্ডিয়ান কুকিং খুব ভাল জানো নিশ্চয়ই।

আমার রন্ধনবিদ্যার পরিচয় দেবার সময় এখনো আসেনি তাই আমিও সব দ্বিধা এবং গলা একই  সঙ্গে ঝেড়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলাম, ইয়ে মানে ওই একটু একটু আর কি।

আসলে কি জানো , তুমি তো বুঝতেই পারছ আমার দেশের খাবারগুলো বড্ড বেশি ব্ল্যানড, এদিকে আমার আবার ভারতীয় রান্না খেয়ে খেয়ে এমন অব্যশ হয়ে গেছে যে স্ত্রী  এত যত্ন  করে যাই রান্না করেছেন কিছুতেই ঠিক প্রাণ খুলে  গ্রেট বলতে পারিনি এবার। সে যে কি কষ্ট।

বলতে বলতেই আবার উদাস হয়ে পড়লেন তিনি। আমি বুঝলাম এই মুহূর্তে স্ত্রীর কথা ভেবে সাঙ্ঘাতিক মন খারাপ করছে ওনার। অনুতপ্তও বটে।

অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে দিল ওঁর কণ্ঠনিঃসৃত ঘোষণা, আগের বার এই ফ্লাইটটাতেই কি অপূর্ব যে একটা বিরিয়ানি সার্ভ  করেছিল না! এবারও যদি ..।

সবটা শোনবার আগেই আমাকে আরেকবার ওয়শরুম  ছুটতে হয়েছিল, একমাত্র ওখানেই একসাথে অনেকক্ষণ  বিনা  ডিসটারবেন্সে হাসা যায় কিনা।

চুপিচুপি আরেকটা কথাও বলে রাখি এখানে, আমি অন্তত আজ অব্দি কোনও সাহেবকে খাওয়ার সময় “আহা”, উহু”, “জীবন সার্থক হয়ে গেল” জাতীয় শব্দবন্ধ প্রয়োগ করতে শুনিনি। অত দূর থেকে পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস টিঃশ্বাসও শুনতে পেয়েছিলাম বললে ডাহা গুল মারা হবে। কিন্তু চোখে যে অতল প্রশান্তি নিয়ে খাওয়া শেষ করে উনি তোয়ালেতে হাত মুছলেন জাস্ট সেটা দেখেই আমি সাড়ে নিরানব্বই পারসেনট শিওর হয়ে গেছিলাম যে এবারের বিরিয়ানিটাও ওনার মোটের ওপর বিশেষ খারাপ লাগেনি!

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: