এবার দেশে

এবার দেশে
দৃশ্য ১- যাবার বেলায়

মন্ট্রিয়ল-ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানের সুসজ্জিত অভ্যন্তরে যা হচ্ছিল-
খুব মন খারাপ। একা একা একলা ঘরে ফেরাটা যে ঠিক কিরকম আমি এই লেখাটায় অন্তত বোঝাতে চাই না। মা বাবার হঠাৎ চলে যাওয়া, একমাত্র মেয়ে হিসেবে না হয়ে ওঠা কাজগুলোর দায়িত্ব ফেরাতে চাইনি। ফেরানো কি যায় কখনো ? ভেতরটা টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও জানতাম একদিন না একদিন সেগুলো আমাকেই করতে হবে। সব মোটামুটি গুছিয়ে আসতে কত সময় লাগতে পারে জানি না আর ময়ূখ অনির্দিষ্টকাল ছুটিও পাবে না। আগে শুরুটা তো করি, ও তারপরে আসবে।
তাই সর্ব অর্থেই একা।
সামনে লম্বা পথ, বুকে অজস্র ভাবনা। প্লেন ছাড়তেই ভেবেছিলাম ভয়াবহ জট পাকানো মাথা টাকে একটু ছাড়িয়ে নিতে হবে, দুটো ভদকা আর টেনে ঘুম। কিচ্ছু ভাবব না, কিচ্ছু ভাবতে চাই না যতক্ষণ না প্লেনটা দমদমের মাটি ছুঁচ্ছে।
গুটিশুটি ঘুমিয়েও পড়েছিলাম বেশ, নিদ্রা ভাঙল এক বিটকেল চিলচিৎকারে। পাঞ্চজন্য টা যেন কার একটা শাঁখ ছিল? সে যারই থাক না কেন, যে ভদ্রলোক সেই শাঁখে নিয়মিত ফুঁ দিতেন তিনিও যে এই আওয়াজে ভিরমি খেতেন তাতে কারুর কোনও সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
চিৎকারটির উৎস সন্ধানে এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়েও ঠিক প্রত্যয় হল না। সত্যি সত্যিই ওইটুকু যন্ত্র দিয়ে এরকম প্রাণঘাতী শব্দ বেরোচ্ছে? মা বাবা তাকে কোলে করে সারা প্লেনে কিছু না হোক চার পাঁচ কিমি পায়চারি করে ফেললেন কিন্তু বিশেষ লাভ হল না। দু মিনিট থামে তো দশ মিনিট প্রবল বিক্রমে হাত পা ছোঁড়ে, সঙ্গে কান্না ফ্রী।
আমি মনে মনে ভাবছি, পাইলট মাঝরাস্তায় কালা হয়ে গেলে কি সেফ ল্যান্ডিং করতে অসুবিধা হতে পারে? এরকম ঘটনার কথা কি আগে কখনো শোনা গেছে? এই মেঘের মধ্যিখানে গুগল ও তো করা যাবে না ছাই।
ইত্যবসরে প্লেনশুদ্ধু লোক মাথা ঘামাতে শুরু করেছেন যে খুদেটার জীবনে ঠিক কি ধরনের সমস্যা হতে পারে।
“খিদে পেয়েছে” থেকে “ফ্লাইট ফোবিয়া” কিছুই বাদ পড়ল না লিস্টে। কে একজন বললেন , ওর মনে হয় পেট ব্যথা করছে, গ্রাইপ ওয়টার দিলে হত না? কিন্তু ওই বস্তুটার বোধহয় এখনো কোনও মেড ইন … সংস্করণ বেরয়নি তাই পূজনীয় জনক জননীর সম্যক বোধগম্য হয়েছে বলে মনে হল না।
এই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা আর কতক্ষণ চলতো জানি না। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন যিনি তাঁর চোখের জ্যোতি নিভে এসেছে অনেকদিন।কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের কোলে তুলে নিলেন পুঁচকে টাকে। আর কোন জাদুমন্ত্রে থেমে গেল কান্না।
বড় হয়ে ম্যান্ডারিন কি ক্যান্টনিজ বলবে যে, নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়লো পাঞ্জাবি লোরির ঘুমপাড়ানি অজানা সুরে।
আর সাদা চুলে ভরা মাথাটা দেখে কিরকম যেন বিচ্ছিরি ব্যথা ব্যথা করে উঠল আমার গলার কাছটা। সেই গন্ধটা, শীতের দুপুরে দিদার কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকবার গন্ধটা…আর একবার যদি…

Advertisements

5 Comments

Add yours →

  1. Loved it.

    Like

  2. akta simple ghotona khub interesting kore likhechis r humor o ache.besh bhalo laglo pore. nexter jonne wait korchi

    Like

  3. I’m not easily imrsdpsee. . . but that’s impressing me! 🙂

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: