ইনট্রো এবং এন্ট্রি

ইনট্রো  এবং এন্ট্রি

নিজেকে নিয়ে লেখাটা কিন্তু বেশ কঠিন কাজ। মানে এতো আর ফেলোশিপ পাওয়ার জন্য ভীষণ বোরিং স্টেটমেন্ট অফ পারপাস লেখা নয়, এটা হচ্ছে হৃদয়ের গভীরতম তন্ত্রীতে চাবুক কষে উত্তর খোঁজবার ব্যাকুল ব্যর্থ চেষ্টা।

কেন লিখি? কিসের জন্য লিখি? লিখলেই যে সে আবোলতাবোল মানুষ পড়বেন এরকম আজগুবি ভাবনা এবং সাহসই বা কোথা থেকে জন্ম নিল? দিব্যি তো পড়াশোনা, চাকরি বাকরি, সংসার ধর্ম নিয়ে থাকলেই হত, সেধে এ জ্বালা কেন ঘাড়ে নেওয়া?

জানি না। সত্যি বলছি এই একটা প্রশ্নেরও ঠিক ঠিক জবাব দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। শুধু এটুকুই জানি যে না লেখা জীবনটা বড্ড বেঠিক হয়ে যেত আমার জন্য।

পরপর ঝড়ের মতো আসা মৃত্যু শোকগুলোও কিছুতেই যুঝতে পারতাম না যদি এই খাতা পেনটা সঙ্গী হতে অস্বীকার করতো।

এরপরের প্রশ্ন হঠাৎ বাংলা কেন? আমি তো অন্য আরেকটা ভাষাতেই লিখে থাকি।

আমার অসীম সৌভাগ্য যে পৃথিবীর নানা প্রান্তে কিছু মানুষ খুব ভালবেসে আমার লেখা পড়েন আর তাঁদের মতামত আমাকে ঋদ্ধ করে প্রতি পলে। এঁদের মধ্যে অনেকেই অনেকবার বলেছেন বাংলায় লেখবার কথা।

কিন্তু দু চারটে এদিক ওদিক খুচরো লেখার বেশি আর কিছু হয়ে ওঠেনি।

তাই আর দেরি করতে চাইনি।

বিশ্বাস করুন আমি নিজেও খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম যখন আবিষ্কার করলাম অবিরত ইংরেজি লিখতে অভ্যস্ত মন-মনন কি ভীষণ ডুব দিতে চাইছে বাংলায়।

কিন্তু কেন? শুধুই মাতৃভাষা বলে কি? যার অশেষ টান থেকে যায় দেশ কালের অতীত হয়ে?  নাকি তার চাইতেও বেশি কিছু?

হয়তো সেটাই।

কিছুতেই ফেরানো যায় না যাকে, সেই যুক্তিতক্কের তোয়াক্কা না করা খেয়ালি ভালবাসারই জন্য।

 

ফ্রেঞ্চ যখন ফ্রেনিমি

আমাকে দেখে একটুও বোঝা না গেলেও একটা কথা কিন্তু আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, সেটি হচ্ছে  যস্মিন দেশে যদাচার। এই আপ্ত বাক্যটা মাথায় রেখেই আমার ফ্রেঞ্চ ক্লাসে ভর্তি হওয়া। মন্ট্রিয়লে এসেছি, বছর পাঁচেক কেটেও গেছে কবে জানি, হঠাৎ মনে হল এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।  হাজার হোক মন্ট্রিয়ল ভীষণ রকম ফরাসীদের জায়গা, এখানে এতদিন থেকেও যদি ভাষাটাই না শিখলাম তাহলে বেডরুম কি বাথরুমের আয়নাটাও স্বস্তি দেবে না।

প্রথম দিনেই ক্লাসটা কিন্তু আমার ভয়ানক পছন্দ হয়ে গেল। তিনতলার ওপরে নরম আলোয় লুটোপুটি করছে ঘরটা। আর রোমানিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, পার্শি, আফ্রিকান কে নেই সেই গর্বিত লিস্টে, শুধু একটা ইংরেজ থাকলেই… কিন্তু নেই যখন কি আর করা যাবে। ওরা কি আর সাধ করে ফ্রেঞ্চ শিখবে কখনো।

আমাদের প্রোফেসর ভদ্রমহিলাও দারুণ, নাম এলেন ডিয়ন। অরিজিনালি হেলেন কিন্তু ফরাসীরা  তো আবার “হ” বলে না কিনা।  উনি যতোক্ষণ সিলেবাস আলোচনা করলেন, আমি পেনসিল চিবুতে চিবুতে গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে রইলাম যে বাই এনি চান্স ইনি কি টাইটানিক খ্যাত গায়িকা সেলিন ডিয়নের বোন-দিদি কেউ? নিদেন পক্ষে কাজিন হলেও বা মন্দ কি! সাংঘাতিক একটা আবিষ্কারের দোরগোড়ায় দাঁড়ানোর উত্তেজনা তখন আমার।

ভুল বুঝবেন না প্লিজ। মন্ট্রিয়লে এলে দেখতেন আমার এরকম উথালপাথাল মানসিক অবস্থার সমুচিত জাস্টিফিকেশন রয়েছে। ডটার অফ দ্য সয়েল সেলিন ডিয়ন এখানে সেমি দেবী হিসেবে পূজিত হন।

সে যাই হোক, আমার ভাবনায় লিটার তিনেক জল পড়ল সুমধুর কণ্ঠে “মাদমোয়াজেল আমি আপনারই সঙ্গে কথা বলছি” শুনে, যারপরনাই লজ্জা টজ্জা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের নাম ধাম সাকিন ঠিকানা হু হু করে বলে গেলাম।

অতীব মন দিয়ে সবকিছু শোনবার পর এলেন বললেন, বাধিত হলাম আপনার সাথে আলাপ হয়ে, আশা করব পরবর্তী দিনগুলি আপনার সাহচর্যে আরও বাঙময় হয়ে উঠবে, শুধু একটাই অনুরোধ মাদমোয়াজেল, আপনার ইংরিজিটা অতি চমৎকার হলেও, এখানে না বললেই ভাল হয়। আমরা ফ্রেঞ্চে বাক্যালাপ করতেই ভালবাসি। আশা করি এর মধ্যেই বিস্মৃত হয়ে পড়েননি যে সেই উদ্দেশ্যেই আপনার এ স্থানে আগমন।

ততোক্ষণে আমার কান টান লাল হয়ে গেছে। কোনোদিকে না তাকিয়েও বেশ বুঝতে পারছি রোমানিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, পার্শি, আফ্রিকান মিচকি হাসিতে কোনও তফাতই নেই আসলে। বিলকুল মনে পড়ছে না যে আমি মোটেই মাদমোয়াজেল নই, এক দস্তুরমতো মাদাম।

সেই মুহূর্তেই আমি ঠিক ঠিক আইডেনটিফাই করে ফেললাম যে কেন এতদিন আমার ফ্রেঞ্চ শেখা হয়নি।

ফ্রেঞ্চ গ্রামার টা যথেষ্ট গোলমেলে হওয়া স্বত্তেও আমি তাকে ঘায়েল করে ফেলেছি। ফ্রেঞ্চে চিঠিও দুতিন লাইন আমি আপনাকে কষ্টে সৃষ্টে লিখে দিতে পারব। কিন্তু আমি যেটি একটুও পারি না, যাচ্ছেটাই রকম পারি না, সেটি হল বলতে।

এই ক বছরে কত বরফ গলে গেল, মাউনট রয়ালের কোলে কতো সূর্য ঢলে পড়ল , আমার বিদ্যে “বোঁ সয়ার” এর বেশি আর এগোল না, ভাল লাগে নাকি?

ক্লাস তো আরম্ভ হয়ে গেল, এলেনের শুষ্কতম চাউনি, কলম্বিয়ান বালকটির নির্বিকার মুখচ্ছবি ইত্যাদি  অভূতপূর্ব রকম বাধাও আমার মুখ খুললেই ইংরিজি বলবার প্রবণতাকে রুখতে পারছে না যখন কিছতেই ঠিক সেই সময়েই ঘটলো কাণ্ডটা।

ক্লাসের ফাঁকে পনের মিনিটের ব্রেকে ময়ুখকে আমি মাথা নেড়ে নেড়ে ফ্রিজে ডালের বাটিটার প্রলিফিক লোকেশন  বোঝাচ্ছি আর ক্রমশই ছেলেদের মস্তিস্কের কোন অঞ্চলে “পাচ্ছি না তো” এক্সপ্রেশন টা লুক্কায়িত থাকে খুঁজে পাবার দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে চলেছি, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে আমার পিঠে টোকাটা ফিল করলাম।

“তুমি বাঙালি?” রুদ্ধশ্বাস প্রশ্ন ছুটে এল এক।

“আল্লা আমি তোমাকে এতদিন দিল্লি বোম্বের মেয়ে ভাবতাম! তাই তো কখনও সাহস করে কথা বলতে পারিনি, আমার হিন্দিটা আবার সেরকম…।”

ক্লাসে খুব কমই ইংরেজি বলি এখন আমি। এলেনের তো খুশি হওয়ারই কথা কিন্তু…!!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

4 Comments

Add yours →

  1. besh bhalo laglo lekhata pore.. R kothata khanti sotyi.. Arek bangali r dekha pelei keno janina bangaira bangla chhara r sob bhasa bhule jay.. 😛

    Like

  2. Khub bhalo lagche lekha gulo pore….Bangla harof er lekha porte etto bhalo lage age kakhono upolabhdhi korini….English moy jiban e Bangla lekha ba boi ek adbhut nirbhejal anonda dey aajkal. 🙂

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: